সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে—যারা দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি করে আসছিলেন, তাদের জন্য মেটার ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা একটি বড় জয়। মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের এমন সব কনটেন্ট দেখায় যা তাদের দেখা উচিত নয়, কিংবা তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। কৃত্রিম ফিল্টারের মাধ্যমে তারা কেমন দেখতে হতে পারত তা দেখিয়ে কসমেটিক সার্জারির দিকে প্ররোচিত করা এবং 'লাইক' ও ভিউয়ের সংখ্যার মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তার পরিমাপ করা কিশোর বয়সীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সমঝোতার আওতায় মেটা তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দৈনিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ, স্কুল চলাকালীন এবং রাতে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'লাইক' না দেখানো এবং অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ফিচারগুলো ঐচ্ছিক না রেখে ডিফল্ট হিসেবে চালু রাখা। কলোরাডোর লরি শট, যার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে ইনস্টাগ্রামের ক্ষতিকর কনটেন্টের কারণে আত্মহত্যা করেছিলেন, তিনি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একে একটি "ভালো দিন" বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, মেটার জন্য ১৮ বিলিয়ন ডলার কোনো বড় ধাক্কা নয়। এই অর্থ তাদের এক মাসের রাজস্বের চেয়েও কম এবং এটি পরিশোধ করতে তারা ১০ বছর সময় পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নির্ভর করছে মেটার প্রতিদ্বন্দ্বী ইউটিউব এবং টিকটক একই ধরনের বিধিনিষেধ মেনে নিতে রাজি হওয়ার ওপর। ২৯টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য যেখানে ২০০ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল এবং কোম্পানিটি আদালতে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার জরিমানা হওয়ার আশঙ্কা করেছিল, সেখানে এই পরিমাণটি খুবই সামান্য। ফলে এই সমঝোতায় মেটার শেয়ারহোল্ডাররা বেশ স্বস্তি পেয়েছেন।
এই সমঝোতার মাধ্যমে মেটা আদালতের কোনো আইনি রায় ছাড়াই পার পেয়ে গেল। ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে শুনানির সময় মেটার সাবেক নিরাপত্তা প্রকৌশলী আর্তুরো বেহার যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছিলেন, তা থেকে কোম্পানিটি রেহাই পেল। বেহার আদালতে জানিয়েছিলেন, তার নিজের কিশোরী মেয়ে ইনস্টাগ্রামে আপত্তিকর যৌন প্রস্তাব ও হেনস্থার শিকার হয়েছিল। তার করা একটি জরিপে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ কিশোর ব্যবহারকারী প্রতি সপ্তাহে ইনস্টাগ্রামে কোনো না কোনো ক্ষতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, অথচ মাত্র ০.০২ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কনটেন্ট মুছে ফেলা হয়। বেহার এই তথ্য সরাসরি মার্ক জাকারবার্গকে জানালেও কোনো উত্তর পাননি। বেহারের ভাষায়, "তারা জানত যে শিশুদের ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বকে বলছিল যে তেমন কিছুই ঘটছে না।" এই সমঝোতায় মেটা নিজেদের কোনো দায়ও স্বীকার করেনি।
এই নতুন নিয়মগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রযোজ্য হবে, যদিও মেটার বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে। ফেসবুকের সাবেক কর্মী সারাহ উইন-উইলিয়ামস তার 'কেয়ারলেস পিপল' বইতে লিখেছেন, কীভাবে কোম্পানিটি আইনি সুরক্ষা কম থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যবহারকারী বাড়াতে মরিয়া ছিল, যা তামাক শিল্পের কৌশলের সাথে মিলে যায়। তামাক কোম্পানিগুলোও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কড়াকড়ির পর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের ব্যবসা ছড়িয়ে দিয়েছিল।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সমঝোতা কেবল শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলে, অথচ প্রাপ্তবয়স্কদের আসক্তি ও ভুয়া তথ্যের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি এখানে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মূল সমস্যা হলো এদের ব্যবসায়িক মডেল, যা ব্যবহারকারীদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করে ডেটা সংগ্রহ করে এবং তা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে।
আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, যখন স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের একচেটিয়া আধিপত্য গ্রাহকদের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়েছিল, তখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এটিকে ৩৪টি ছোট কোম্পানিতে বিভক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। মেটাও এখন একটি একচেটিয়া ব্যবসার মতো কাজ করছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা অন্য কোথাও যেতে পারেন না কারণ তাদের সব পরিচিত মানুষ এই প্ল্যাটফর্মেই রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় কমিটির সাবেক প্রধান ড্যামিয়ান কলিন্স বলেছেন, মেটা জেনেশুনে ব্যবহারকারীদের দুর্বলতাকে কাজে লাগায় এবং নিরাপত্তা বাড়াতে অনীহা দেখায়। ব্যবহারকারীরা যদি তাদের ডেটা অন্য প্ল্যাটফর্মে সহজে স্থানান্তর করতে পারতেন, তবে এই একচেটিয়া রাজত্ব ভেঙে ফেলা সম্ভব হতো। মেটা হয়তো সাময়িকভাবে বিচার এড়াতে পেরেছে, কিন্তু তাদের ক্ষমতা খর্ব করার চূড়ান্ত সময় একদিন অবশ্যই আসবে।































