ভারতীয় নৌবাহিনীর সব যুদ্ধজাহাজে ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ মূলত স্থল ও আকাশপথে সীমাবদ্ধ থাকলেও, নৌবাহিনীও নিজেদের অবস্থানে সক্রিয় ছিল। সেই সংকটের সময় ভারত আরব সাগরে আইএনএস বিক্রান্ত মোতায়েন করলেও পরবর্তীতে তা কর্ণাটকের ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে, পাকিস্তান নৌবাহিনী তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো ছড়িয়ে দেয়, সামুদ্রিক নজরদারি বা আইএসআর জোরদার করে এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখে। তবে সে সময় দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে সরাসরি কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং আইএনএস বিক্রান্ত পরিদর্শনকালে পাকিস্তানকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান যদি আবারও কোনো অশুভ প্রচেষ্টা চালায়, তবে নৌবাহিনীই প্রথম পদক্ষেপ নিতে পারে। এই ঘটনার পর থেকেই উভয় দেশ তাদের নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ভারতীয় নৌবাহিনী ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের নৌবহরের প্রতিটি যুদ্ধজাহাজে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে।
বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনী ২০টি প্রধান যুদ্ধজাহাজে ব্রহ্মোস, তালওয়ার-শ্রেণির ফ্রিগেটে ক্লাব সিরিজ, পুরনো সিস্টেমে কেএইচ-৩৫ই উরান এবং সাবমেরিনে ফ্রেঞ্চ এক্সোসেট ও আমেরিকান হার্পুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। তবে ২০২৫ সালের মে মাসের সংকটে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ায় ভারত এই দেশীয় প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৪ সালে ভারতের ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি নৌবাহিনীর জন্য ২২০টি এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ (ইআর) ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র কেনার অনুমোদন দেয়। ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রায় ম্যাক ৩ গতিতে চলতে সক্ষম, যা শত্রুপক্ষকে শনাক্ত ও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার খুব কম সময় দেয়। এছাড়া এর নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা চলমান যুদ্ধজাহাজকে আঘাত করার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানও নিজেদের সমুদ্র নিরাপত্তা জোরদার করতে কাজ করছে। তারা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি পি২৮২ স্ম্যাশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জুলফিকার-শ্রেণির ফ্রিগেট ও বাবর-শ্রেণির করভেটে যুক্ত করেছে। এছাড়া পাকিস্তানের বহরে হারবাহ সাবসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, চীনা প্রযুক্তির ওয়াইজে-৮৩ এবং তাইমুর এয়ার-লঞ্চড ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। বাবর-শ্রেণির করভেটে সিএএমএম-ইআর এবং তুঘরিল-শ্রেণির ফ্রিগেটে এলওয়াই-৮০ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে পাকিস্তান ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যদি সফলভাবে তাদের সব যুদ্ধজাহাজে ব্রহ্মোস যুক্ত করতে পারে, তবে পাকিস্তানের ওপর সামুদ্রিক নজরদারি বাড়ানোর প্রবল চাপ তৈরি হবে। এছাড়া, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের দ্বৈত সক্ষমতা—অর্থাৎ প্রচলিত ও পারমাণবিক অস্ত্র বহনের ক্ষমতা—নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে ভারতের একটি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ভুলবশত নিক্ষেপের ঘটনা পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই দেশের কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থার ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর দীর্ঘ পাল্লা, উচ্চ গতি এবং পারমাণবিক ও প্রচলিত যুদ্ধের সংমিশ্রণ দক্ষিণ এশিয়ার সংকট ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। এই উন্নয়নগুলো আরব সাগরকে একটি সংবেদনশীল রণক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে পুরো ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।






























