হরমুজ প্রণালীর লারাক দ্বীপে মার্কিন বাহিনীর হামলার প্রতিক্রিয়ায় জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। জুলাই মাসের শেষভাগের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে এটিই প্রথম সরাসরি সামরিক সংঘাত। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন হামলা ও ইরানের প্রতিক্রিয়া
ইরানের এই পাল্টা পদক্ষেপের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল যে, তারা লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করেছে। অ্যারাবিককে দেওয়া তথ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই লঞ্চারগুলো হরমুজ প্রণালীর দিকে সামুদ্রিক মাইনবাহী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন সেন্টকম (CENTCOM) এক্সে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছে, লারাক দ্বীপে তাদের অভিযান ছিল সীমিত ও সুনির্দিষ্ট, যা বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিচালিত হয়েছে।
তবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) মার্কিন এই দাবিকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, রবিবার রাতের ওই মার্কিন হামলায় বেশ কয়েকজন ইরানি সেনা ও বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। আইআরজিসির মুখপাত্র সরদার মোহেবি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কৌশলগত ও মারাত্মক ভুল’ করার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন এবং এর জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের মন্তব্য
হামলার পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এসে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান ‘যুদ্ধ খুঁজছে না’, তবে যেকোনো আগ্রাসনের মুখে তারা ‘কখনোই চুপ থাকবে না’। ফারস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, তিনি আরও বলেন, ইরান আক্রান্ত হলে আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও চূড়ান্ত জবাব দেবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আঞ্চলিক অস্থিরতা কোনো দেশেরই স্বার্থে নয় এবং এটি সবার জন্যই চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।’
জর্ডান ও আমিরাতে পাল্টা আঘাত
মার্কিন হামলার পরপরই আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানের কিং হোসেন এবং আল-আজরাক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, এই হামলায় মার্কিন ঘাঁটির প্রযুক্তিগত ও মেরামত অবকাঠামো এবং যুদ্ধবিমান মোতায়েনের স্থানগুলো ধ্বংস হয়েছে। তেহরান এই হামলাকে জাতিসংঘের সনদের অধীনে ‘আত্মরক্ষার বৈধ চর্চা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। একইসঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও মার্কিন সামরিক সম্পদ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ট্রাম্পের দাবি
- সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে এক বিবৃতিতে ইরানের এই আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দাবি করেছেন যে, খারগ দ্বীপ ‘সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস’ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই দাবির বিষয়ে ইরান এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
- গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী থেকে সমস্ত মাইন অপসারণ করা হয়েছে এবং নতুন করে মাইন বসানোর চেষ্টা করলে সেই জাহাজ বা নৌকা ধ্বংস করা হবে।
- ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলাকে ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সরাসরি লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি
বিশ্লেষকদের মতে, গত ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে অর্থনৈতিক চাপের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যাকে তারা ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বা ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেকোনো সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা কঠোর জবাব দেবে এবং এই উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের দায়ী করেছে। এদিকে, মার্কিন সেন্টকমের দাবি, ইরানই মূলত হুমকি তৈরি করেছিল এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী বেসামরিক নাবিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষায় সেই হুমকি দূর করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা




























