গতকাল ৩১ আগস্ট ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিন। ১৯৩৩ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী এই গুণী শিল্পী বেঁচে থাকলে গতকাল তাঁর বয়স হতো ৬৩ বছর। ২০১৩ সালের ৩০ মে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে আকস্মিক প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা সিনেমার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল। তবে মৃত্যুর ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র, সংলাপের গভীরতা, পোশাকের নান্দনিকতা এবং তাঁর নিজস্ব জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
ঋতুপর্ণ ঘোষের কর্মজীবন ছিল দুই দশকের। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর কাজের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের মনের ভেতরের অদৃশ্য টানাপোড়েনকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা। তিনি খুব বেশি ক্যামেরা ঘোরানোর চেয়ে স্থির দৃশ্যের মাধ্যমে চরিত্রের ভেতরের নীরবতা ও অভিমানকে তুলে ধরতে পছন্দ করতেন। তাঁর সিনেমায় আদিগন্ত মাঠের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বনেদি বাড়ির বন্ধ দরজা, পর্দা টানা জানালা এবং ঘরের ভেতরের আবছা আলো।
পরিচালক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘হীরের আংটি’ দিয়ে। তবে ‘উনিশে এপ্রিল’ সিনেমাটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়, যা শ্রেষ্ঠ বাংলা কাহিনিচিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পায়। এরপর ‘দহন’, ‘অসুখ’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘উৎসব’, ‘তিতলি’, ‘শুভ মহরত’, ‘চোখের বালি’, ‘রেইনকোট’, ‘অন্তরমহল’, ‘দোসর’, ‘খেলা’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, ‘আবহমান’, ‘নৌকাডুবি’ এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’র মতো কালজয়ী সব ছবি উপহার দিয়েছেন তিনি।
নারীদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করলেও তিনি তাঁদের কেবল মা, স্ত্রী বা প্রেমিকার ছাঁচে আটকে রাখেননি। তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্ররা ভুল করে, ঈর্ষান্বিত হয়, আবার ভালোবাসতেও জানে। ‘চোখের বালি’ সিনেমায় বিধবা বিনোদিনীর প্রেম ও অধিকারবোধকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছিলেন, তা তৎকালীন সামাজিক ধারণাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। গয়না ও রঙিন পোশাকে বিনোদিনীর উপস্থিতি ছিল প্রথাগত নিয়মের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
তারকাদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রাইমা সেনের পাশাপাশি অমিতাভ বচ্চন, ঐশ্বরিয়া রাই, অভিষেক বচ্চন, অজয় দেবগন, শর্মিলা ঠাকুর, রাখি গুলজার ও বিপাশা বসুর মতো শিল্পীদের তিনি তাঁদের পরিচিত ভাবমূর্তির বাইরে গিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই কৌশল শিল্পমান বজায় রেখেও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।
কর্মজীবনের শেষ দিকে এসে ঋতুপর্ণর সিনেমা ও ব্যক্তিজীবনের দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছিল। জেন্ডার ও যৌন পরিচয় নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার রক্ষণশীল সমাজে ছিল এক সাহসী পদক্ষেপ। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ ও ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সমকামী মানুষের নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক অস্বীকৃতিকে সামনে নিয়ে আসেন। নিজের পরিচালিত ‘চিত্রাঙ্গদা’য় রুদ্র চরিত্রে অভিনয় করে তিনি শরীর ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নকে আরও ব্যক্তিগত স্তরে নিয়ে যান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ঋতুপর্ণর সৃজনশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘চোখের বালি’ ও ‘নৌকাডুবি’র পাশাপাশি ‘চিত্রাঙ্গদা’য় রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যকে তিনি সমকালীন জীবনের আলোয় পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন তথ্যচিত্র ‘জীবনস্মৃতি’। চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে ঋতুপর্ণর শেষ ফেসবুক পোস্টে রবীন্দ্রনাথের সেই আকুল আহ্বান ছিল—‘মনে রেখো আমায়।’
ঋতুপর্ণ ঘোষ কেবল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, লেখক, সম্পাদক ও সঞ্চালক। ‘আনন্দলোক’ ও ‘রোববার’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পভাবনা মিলিয়ে তিনি নিজেই একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন।
আজকের দ্রুতগতির সময়ে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন, তখন ঋতুপর্ণর সিনেমার স্থিরতা ও গভীরতা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, মানুষের দিকে তাকানোর একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিলেন। তাঁর কাজ আজও দর্শককে থামতে শেখায়, নীরবতা শুনতে শেখায় এবং সম্পর্কের জটিল সমীকরণ বুঝতে সাহায্য করে।
৩১ আগস্ট তাঁর জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি, সংলাপ ও সাক্ষাৎকারের নানা অংশ শেয়ার করে ভক্ত ও অনুরাগীরা শ্রদ্ধাভরে তাঁকে স্মরণ করেছেন। চলে যাওয়ার এত বছর পরও তাঁর সৃষ্টি ও সাহসিকতা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অমলিন স্বাক্ষর হয়ে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে একচিলতে আলো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাছাকাছি থেকেও মানুষগুলোর মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ কথা বলতে চেয়েও থেমে যাচ্ছেন, কেউ বছরের পর বছর জমিয়ে রেখেছেন অভিমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে আছে ভালোবাসা, ঈর্ষা, অপরাধবোধ ও না-পাওয়ার বেদনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দৃশ্যমান ঘটনার চেয়ে চরিত্রের মনের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য টানাপোড়েনই ছিল তাঁর আগ্রহের জায়গা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৬৩ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রভাবশালী এই নির্মাতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মা ও মেয়ের দীর্ঘদিনের অভিমান নিয়ে ‘উনিশে এপ্রিল’, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক নারীর লড়াই নিয়ে ‘দহন’, একাকী নারীর নিঃসঙ্গতা ও প্রতারিত হওয়ার গল্প নিয়ে ‘বাড়িওয়ালি’, পারিবারিক পুনর্মিলনের আড়ালে সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে ‘উৎসব’—একটির পর একটি ছবিতে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত।
সূত্র: প্রথম আলো





























