লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এখন প্রদর্শিত হচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর যুদ্ধচিত্র 'বায়েক্স ট্যাপেস্ট্রি' (Bayeux Tapestry)। লিনেন কাপড়ের ওপর সুতোর বুননে তৈরি এই মধ্যযুগীয় শিল্পকর্মটি দর্শকদের এক অদ্ভুত নিয়তি ও ধ্বংসের অনুভূতির মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই সূচিকর্মটি তার নিখুঁত ও গতিশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে সব ধরনের প্রচলিত শৈল্পিক নিয়মকে ছাড়িয়ে গেছে।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের একটি দীর্ঘ গ্যালারিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এটি প্রদর্শন করা হচ্ছে। দর্শনার্থীরা বর্ম, প্রাচীন নথির উদ্ধৃতি এবং তথ্যচিত্রের মধ্য দিয়ে গিয়ে এই দীর্ঘ ট্যাপেস্ট্রিটির মুখোমুখি হন। কাচের বিশেষ বেষ্টনীতে ঢাকা এই শিল্পকর্মটির ওপর নিখুঁত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা অন্ধকার ঘরে এর তামাটে, সবুজ ও হলুদ রঙগুলোকে ফুটিয়ে তোলে। তবে প্রদর্শনীতে ড্রাম বা ট্রুবাডরদের সুরের মতো কোনো আবহসংগীত না থাকায় লেখক কিছুটা খামতি অনুভব করেছেন। প্রায় ৪০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে এই ট্যাপেস্ট্রির প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রত্যক্ষ করা যায়।
এই শিল্পকর্মটির মূল উপজীব্য হলো ১০৬৬ সালের ১৪ই অক্টোবর সংঘটিত হেস্টিংসের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। সেদিন অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ডের সদ্য মুকুটধারী রাজা হ্যারল্ডের মুখোমুখি হয়েছিল নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়ামের সদ্য আগত বাহিনী। দিনের শেষে হ্যারল্ড ও তাঁর অসংখ্য সৈন্যের মৃত্যুর মাধ্যমে নরম্যানরা ইংল্যান্ড জয় করে। ইতিহাস বদলে দেওয়া এই যুদ্ধটি এমন এক বিশাল সংঘাতের গল্প বলে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ফিলিপ ২, নেপোলিয়ন বা হিটলার যা করতে পারেননি, নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম তা করে দেখিয়েছিলেন।
ট্যাপেস্ট্রির বুননে নরম্যান অশ্বারোহী বাহিনীর তীব্র আক্রমণ এবং স্যাক্সনদের কুঠার হাতে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের দৃশ্যগুলো অত্যন্ত জীবন্ত। একটি দৃশ্যে গতি বোঝাতে দুই বার্তাবাহকের চুল সোজা হয়ে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা সে সময়ের তুলনায় অত্যন্ত আধুনিক। নরম্যান ঘোড়াগুলোর শান্তভাবে এগিয়ে চলা থেকে শুরু করে হঠাৎ তীব্র গতিতে ছুটে যাওয়ার প্রতিটি ধাপ এখানে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা যেন ইডউইয়ার্ড মাইব্রিজের গতিশীল আলোকচিত্রের সিকোয়েন্সের ১১শ শতাব্দীর এক অনন্য সংস্করণ।
মূল কাহিনীর পাশাপাশি এর ওপর এবং নিচের সীমানায় (বর্ডার) গ্রিফিন, ড্রাগন ও ডানাবিশিষ্ট শিকারি পাখির মতো পৌরাণিক প্রাণীদের চিত্র রয়েছে। আকাশের মহাজাগতিক ঘটনা বোঝাতে ওপরের সীমানায় হ্যালির ধূমকেতুকে রকেটের মতো ছুটে যেতে দেখা যায়। আবার যখন হেস্টিংসের যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়, তখন নিচের সীমানায় মৃতদেহ এবং ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্তূপ জমতে থাকে।
ক্ষমতার এই লড়াইয়ের সমান্তরালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও এতে স্থান পেয়েছে। একদিকে যুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে কৃষকরা জমিতে লাঙ্গল দিচ্ছে ও বীজ বুনছে। নরম্যানদের ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখছে এক মা ও শিশু, আবার যে সৈন্যটি আগুন দিচ্ছে তার মুখাবয়বেও এক ধরণের দ্বিধা ও দুঃখের ছাপ স্পষ্ট। যুদ্ধের বীভৎসতা ফুটিয়ে তুলতে শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ মৃত নাইটদের বর্ম খুলে নিচ্ছে এবং তাদের নগ্ন নিথর দেহগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে রয়েছে। ১১শ শতাব্দীর এই প্রতিভাবান শিল্পী ও কারিগরদের অসাধারণ সততা ও শৈল্পিক নৈপুণ্যই বায়েক্স ট্যাপেস্ট্রিকে কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মারক নয়, বরং যুদ্ধের উন্মাদনার এক সর্বজনীন দলিল করে তুলেছে।




























