মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিজেদের দে-ফ্যাক্টো বা কার্যত শাসন প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। তবে সম্প্রতি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত একটি ভয়াবহ তদন্ত প্রতিবেদন এবং রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর দলটির ক্রমাগত নিপীড়ন এই স্বীকৃতির পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইচআরডব্লিউ-এর ‘কঙ্কাল ও খুলি সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের ২ মে রাখাইনের বুথিডং শহরের হইয়ার সিরি (বর্মী ভাষায় হ্টান শাউক কান) গ্রামে আরাকান আর্মি অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে, যার মধ্যে ৯০ জনই ছিল শিশু। এছাড়া আরও শত শত মানুষকে হত্যা বা আহত করা হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ড আরাকান আর্মির দীর্ঘমেয়াদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি অংশ মাত্র। ২০২৩-২০২৪ সালের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো যুদ্ধাপরাধের পাশাপাশি তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা, চাঁদাবাজি এবং জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের মতো নিপীড়নমূলক নীতি চাপেই দিয়েছে। এমনকি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহারের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তারা। আরাকান আর্মির প্রধান কমান্ডার এবং ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ)-এর চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল তওয়ান ম্রাত নাইং প্রকাশ্যে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অথচ ২০১৭ সালের জাতিগত নিধনযজ্ঞের আগে রাখাইনের মোট জনসংখ্যার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই ছিল রোহিঙ্গা।
বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে দুটি সমান্তরাল সরকার সক্রিয় রয়েছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এবং চিন রাজ্যের পালেতওয়া শহর নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে তাদের গঠিত ‘আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গভর্নমেন্ট’ (এপিআরজি) কার্যত শাসন চালাচ্ছে। অন্যদিকে, সামরিক জান্তা সমর্থিত রাখাইন রাজ্য সরকার কেবল রাজধানী সিতওয়ে, কৌশলগত বন্দর কিয়াকফিউ এবং অ্যান শহরের কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সিতওয়ের নিয়ন্ত্রণ জান্তা সরকারের হাতে থাকায় কোনো বিদেশি রাষ্ট্র এপিআরজি-কে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। তবে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো মানবিক সংকট এড়াতে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ রাখছে। এই সুযোগে আরাকান আর্মি তাদের কাছ থেকে এক ধরনের ‘দে-ফ্যাক্টো’ বা অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছে।
রাখাইন রাজ্যের ভূ-কৌশলগত গুরুত্বকে নিজেদের দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে আরাকান আর্মি। এই অঞ্চলে রয়েছে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ, ভারত মহাসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার এবং চীন ও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পসমূহ। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, আরাকান আর্মিকে কোনো ধরনের স্বীকৃতি দেওয়ার আগে আঞ্চলিক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, রাখাইনে এখনও যুদ্ধ চলছে এবং সেখানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নাতীত নয়। চিন রাজ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পালেতওয়ায় আরাকান আর্মির উপস্থিতির বিরোধী। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সাথে আরাকান আর্মির আচরণ মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশি নাগরিকদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ এবং অবৈধ কর আদায়ের মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে তারা।
সর্বোপরি, আরাকান আর্মি এখনও পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আইনসম্মত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো সদিচ্ছা দেখায়নি। তারা কেবল রোহিঙ্গাদের অধিকারই হরণ করেনি, বরং চাকমা ও চিন সম্প্রদায়ের মতো অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপরও নিপীড়ন চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মিকে কোনো ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া নৈতিক ও বাস্তবসম্মত—উভয় দিক থেকেই ভুল হবে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আরাকান আর্মির স্বীকৃতির বিষয়টিকে কিছু শর্তের অধীনে আনা। এর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা, একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে দায়িত্বশীল আচরণ করা।




























