যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত মারিয়া লুইজা রিবেরো ভিওত্তির ভিসা বাতিল করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট)। তবে মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্রাজিলে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত ড্যানিয়েল পেরেজকে দেশটির সরকার কূটনৈতিক অনুমোদন (অ্যাগ্রিমেন্ট) দিলে অবিলম্বে ভিওত্তির ভিসা পুনর্বহাল করা হবে।
ফ্লোরিডা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের রিপাবলিকান স্পিকার এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ঘনিষ্ঠ মিত্র ড্যানিয়েল পেরেজকে ব্রাজিলে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু ব্রাজিল সরকার পেরেজের নিয়োগে অনুমোদন না দেওয়ায় তিনি এখনও দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। মার্কিন এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ব্রাজিল শুধু এই অনুমোদন দিতে বিলম্বই করছে না, বরং তাদের আগামী নির্বাচনের পর পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া বেশ কিছু কূটনৈতিক বিরোধের জের ধরেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন মনে করে, এই অনুরোধের বিষয়ে ব্রাজিল সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেওয়া উচিত।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ব্রাজিল সরকার। এক বিবৃতিতে তারা একে "মিথ্যা অজুহাতে" নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ব্রাজিলের দাবি, কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রদূতের নাম চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সম্মতি নেওয়া আবশ্যক এবং সম্মতি পাওয়ার পরেই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই নিয়ম লঙ্ঘন করে আগেভাগেই পেরেজের নাম ঘোষণা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আজকের এই সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বৈরী পদক্ষেপের একটি অংশ, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।"
দুই দেশের মধ্যে ভিসাসংক্রান্ত বিরোধ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত জুলাই মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দুই কর্মকর্তার ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় ব্রাজিল। সে সময় ব্রাজিলের অভিযোগ ছিল, ওই কর্মকর্তারা দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং জানায় যে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম ব্যুরোর কর্মকর্তাদের ওই সফর ছিল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক কার্যক্রমের অংশ।
ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা আসন্ন নির্বাচনে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর ছেলে সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগে বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ হলো গত মাসে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ। মার্কিন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিসহ বেশ কিছু "অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলনের" অভিযোগ তুলে ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নেয়। প্রেসিডেন্ট লুলা এই শুল্ক আরোপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অন্যায্য বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, "আমাদের দেশের বিরুদ্ধে এমন একতরফা পদক্ষেপের কোনো যৌক্তিকতা নেই। খোদ মার্কিন সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে ব্রাজিলের সঙ্গে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২৪.৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রয়েছে।"
শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে লুলা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং এর পেছনে সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফর করে যাওয়া ফ্লাভিও বলসোনারোর হাত রয়েছে। ফ্লাভিও বলসোনারোর মে মাসের ওই সফরের পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের দুটি মাদক চোরাচালানকারী গোষ্ঠী ‘কোমান্দো ভেরমেলহো’ এবং ‘প্রিমিইরো কোমান্দো দা ক্যাপিটাল’কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। লুলা এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে বলেন, "আমরা শিশুদের মতো আচরণ সহ্য করব না, আমরা কোনো বেনানা রিপাবলিকের মতো আচরণও মেনে নেব না।" তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, "রুবিও বলতে চেয়েছেন আমাদের দেশের অপরাধীরা সন্ত্রাসী এবং আমেরিকানরা এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে।"






























