জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহীদদের পরিবার ও আহতদের দায়িত্ব নেওয়াকে সরকারের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বিশেষ করে যারা দৃষ্টিশক্তি ও অঙ্গ হারিয়েছেন, তাদের সুস্থ করে তোলার পুরো দায়িত্ব সরকারকে পালন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বুধবার রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্য দেওয়ার আগে তিনি শহীদ পরিবার ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন।
এর আগে দুপুর ১২টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এ সময় জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে। আমাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবেন।
নতুন এই যাত্রাপথে মতের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। কোনো ধরনের বিভাজন, বিদ্বেষ বা সংকীর্ণ স্বার্থ যেন জাতীয় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা তো আর আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না। খুন, গুম, মানিলন্ডারিং, নির্যাতন ও আয়নাঘরের মতো ভয়াবহ অভিযোগ থাকার পরও আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। তাদের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, "আসেন, দেশে এলে দেখা হবে রাজপথে।" নিজের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে ৮২ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তিনি ২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। প্রয়োজনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই বয়সেও আরেকটি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত আছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, দেশে জনগণের শাসন ও গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ী করা হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে গৌরবের আখ্যা দিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশের নাগরিকের মধ্যেই এমন সাহস আছে, যারা আবু সাঈদের মতো বুক টান করে বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন। জুলাইযোদ্ধাদের সান্ত্বনা দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যারা জীবন দিয়েছিলেন, তারাও হয়তো সবকিছু পাননি। জুলাইযোদ্ধারাও হয়তো সবকিছু পাবেন না, তবে এই সরকারের কাছ থেকে তারা সর্বোচ্চ সম্মান পাবেন এবং দেশের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের কল্যাণে সবকিছু করা হবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—দুটিকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। দেশে যতদিন গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ততদিন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে। আন্দোলনে শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তিনি আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এনাম, তাইম, নাইমা এবং শিশু ইয়াকুব ও আহাদসহ হাজারো শহীদের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাদের এই আত্মদান ও দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আজীবন অনুপ্রাণিত করবে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের সমর্থনে গঠিত একটি সরকার, তারা আকাশ থেকে উড়ে এসে ক্ষমতায় বসেনি। তাই এই সরকারের প্রতি সবার শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকা উচিত। সরকার ভুল করলে তার জন্য মূল্য দিতে হবে, তবে সবাইকে মিলে সেই ভুল সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। আহতদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে এক মা তার অন্ধ ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যে ছেলেটি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য চোখ হারিয়েছে। তাদের যদি যথাযথ মর্যাদা না দেওয়া হয় এবং সামান্য চাওয়া-পাওয়ার জন্য মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তবে তা পুরো জাতির জন্য লজ্জাজনক হবে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম।

























