দুবাইয়ের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু একটি অদ্ভুত ও কৌতুকপূর্ণ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থায়নে গড়ে তুলেছেন একটি অনন্য সম্পর্ক উন্নয়ন টুল। এই উদ্যোগটি মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা নিরসনে সহায়তা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
দুবাইয়ের বাসিন্দা জাইনাব ইমিচি আলহাসান বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন যখন তার স্বামী হঠাৎ করেই তাকে “হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট, ডিয়ার” এবং “অল ডান, মাই ডার্লিং”-এর মতো অস্বাভাবিক মিষ্টি সব টেক্সট পাঠাতে শুরু করেন।
সাধারণত তাদের মধ্যে এ ধরনের কথা বলার চল ছিল না, তাই জাইনাব তাৎক্ষণিকভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে তার স্বামী হয়তো তাকে নিয়ে মজা করছেন। তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু সারাহ কার্টিস তখন তার পাশেই ছিলেন এবং মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তার স্বামী কি কোনো এআই বট ব্যবহার করা শুরু করেছেন কি না।
যদিও সেটি কেবলই একটি কৌতুক ছিল, কিন্তু এই প্রশ্নটি তাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুবাই-ভিত্তিক এই দুই উদ্যোক্তা ‘গুড হাজব্যান্ড’ নামের একটি এআই-চালিত যোগাযোগ টুলের প্রথম সংস্করণ তৈরি করে ফেলেন, যা পুরুষদের তাদের সঙ্গীদের সাথে কঠিন আলাপচারিতার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
জাইনাব আলহাসান বলেন, “মানুষ বর্তমানে ইমেইল বা কঠিন বার্তার উত্তর লিখতে নিয়মিত এআই ব্যবহার করছে। যেহেতু যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন নিয়ে কাজ করাই সারাহ এবং আমার পেশা, তাই আমরা ভেবেছি মানুষের সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করার জন্য আমাদের চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে?”
আলহাসান এবং কার্টিস দীর্ঘ সময় ধরে জনসংযোগ বা পিআর সেক্টরে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে তারা যৌথভাবে ‘পপ কমিউনিকেশনস’ নামে একটি এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ‘গুড হাজব্যান্ড’ তাদের সেই দীর্ঘদিনের পেশাদার অভিজ্ঞতারই একটি ফসল, যা ভাষার প্রয়োগ কীভাবে একটি বার্তার অর্থ বদলে দিতে পারে তা বুঝতে সাহায্য করে।
এই প্ল্যাটফর্মটি এমন পুরুষদের জন্য ব্যক্তিগত কোচিং এবং ব্যক্তিগতকৃত উত্তরের পরামর্শ প্রদান করে, যারা তাদের সম্পর্ক নিয়ে সচেতন কিন্তু সংবেদনশীল মুহূর্তে নিজেদের মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশ করতে হিমশিম খান। প্রতিষ্ঠাতাদের মতে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কখনোই প্রকৃত যোগাযোগকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং ব্যবহারকারীদের তাদের মনের কথা আরও চিন্তাশীলভাবে প্রকাশ করতে সহায়তা করা।
৩৪ বছর বয়সী নাইজেরিয়ান উদ্যোক্তা জাইনাব আলহাসান ২০১৩ সালে দুবাইতে চলে আসেন। অন্যদিকে, ৩৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ উদ্যোক্তা সারাহ কার্টিস তার এক বছর আগে দুবাইতে পাড়ি জমান। তাদের বন্ধুত্ব এবং পেশাদার ক্যারিয়ার একই সাথে বিকশিত হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের একাধিক ব্যবসা একসাথে গড়ে তোলার পথে নিয়ে গেছে।
জাইনাব বলেন, “সারাহ এবং আমি খুব ভালো বন্ধু। আমরা প্রায় সবকিছুই একসাথে করি এবং আমাদের সময়ের বেশিরভাগ অংশ একে অপরের সাথে কাটাই।” এই ঘনিষ্ঠতা ‘গুড হাজব্যান্ড’ তৈরির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কোনো দীর্ঘ উন্নয়ন প্রক্রিয়া বা বাইরের বিনিয়োগ ছাড়াই তারা নিজেরাই এই ধারণাটি পরীক্ষা করেছেন এবং প্রথম সংস্করণটি তৈরি করেছেন।
বর্তমানে কোম্পানিটি সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজেদের অর্থায়নেই পরিচালিত হচ্ছে। যদিও ‘গুড হাজব্যান্ড’ নতুন একটি উদ্যোগ, তবে এর প্রতিষ্ঠাতারা ‘পপ কমিউনিকেশনস’-এর প্রায় দশ বছরের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে এটি পরিচালনা করছেন, যা এই অঞ্চলে ২০০টিরও বেশি ক্লায়েন্টের সাথে কাজ করেছে।
তাদের ব্যবসাগুলো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কোভিড মহামারি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার মতো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েও টিকে থেকেছে। সারাহ কার্টিস বলেন, “সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সহনশীলতা বা রেজিলিয়েন্স অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন সময় সবসময়ই আসবে, কিন্তু যে ব্যবসাগুলো টিকে থাকে, সেগুলো মূলত তারাই যারা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়।”
উদ্যোক্তারা স্বীকার করেন যে, ব্যবসার এই যাত্রায় বারবারই তাদের মনে হয়েছে প্রচলিত চাকরি করা হয়তো অনেক সহজ ছিল। তারা বলেন, “প্রতিটি উদ্যোক্তারই এমন মুহূর্ত আসে যখন তারা নিজেদের কাজের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ব্যবসা গড়ে তোলা যেমন অবিশ্বাস্য রকমের ফলপ্রসূ, তেমনি এটি মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ক্লান্তিতে ভরা।” তবে এই মুহূর্তগুলো তাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করার মতো যথেষ্ট দীর্ঘস্থায়ী ছিল না।
তাদের মতে, রাজস্ব, পুরস্কার বা ব্যবসার বিস্তার তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন নয়। সারাহ বলেন, “আমরা দুজনেই এমন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারছি যা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আবার একই সাথে পরিবারের পাশেও থাকতে পারছি। আমরা একে সহজভাবে নিই না। অর্থবহ কাজ করার পাশাপাশি প্রিয়জনদের সময় দিতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা।”
তাদের পরিবারগুলোতে ব্যবসায়িক ও উদ্যোক্তা হওয়ার পটভূমি থাকলেও, আলহাসান এবং কার্টিসকে নিজেদের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিজেদেরই তৈরি করতে হয়েছে। তাদের তৈরি উদ্যোগগুলো তাদের বাবা-মায়ের ব্যবসার চেয়ে আলাদা ছিল, যার ফলে তাদের শেখার প্রক্রিয়াটি মূলত অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
কার্টিস নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “শুধু শুরু করো। তুমি হাজারটা বই পড়তে পারো, সব পডকাস্ট শুনতে পারো এবং পৃথিবীর সব পরামর্শ নিতে পারো, কিন্তু একটি ব্যবসা বাস্তবে গড়ে তোলার মতো শিক্ষা অন্য কিছু দিতে পারবে না।”
উভয় উদ্যোক্তাই সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এবং সেই পেশাদার সম্পর্কগুলোই পরবর্তীতে তাদের ব্যবসার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। আলহাসান বলেন, “আমরা এমন একদল মানুষের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পেরেছি যারা আমাদের সমর্থন করেন, আমাদের কাজের প্রশংসা করেন এবং এমন সব জায়গায় আমাদের নাম সুপারিশ করেন যেখানে আমরা পৌঁছানোর কথা কল্পনাও করিনি।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে জাইনাব আলহাসান বলেন, “আমি আশা করি, পাঁচ বছর পর ‘গুড হাজব্যান্ড’ বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পুরুষকে আরও চিন্তাশীল এবং কার্যকর যোগাযোগকারী হতে সাহায্য করবে।”
সূত্র: গালফ নিউজ






























