অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাগুলোতে প্রত্নতত্ত্বকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সেবাস্তিয়া ও হেরোডিয়ামের শত শত একর জমি নতুন জাতীয় উদ্যান নির্মাণ ও সংরক্ষণের নামে অধিগ্রহণ করছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এই পদক্ষেপের কারণে ফিলিস্তিনি ভূমিমালিক, স্থানীয় প্রশাসন এবং ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিম তীরের প্রাচীন রোমান কলাম সমৃদ্ধ এলাকা সেবাস্তিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে বহু প্রজন্ম ধরে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো জলপাইয়ের চাষ করে আসছে। স্থানীয় ফিলিস্তিনি ভূমিমালিক আবু মুদিফ সম্প্রতি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি নোটিশ পেয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, একটি নতুন জাতীয় উদ্যান গড়ে তোলার অংশ হিসেবে তার জমিসহ প্রায় ৪৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। সাধারণত ফিলিস্তিনিদের এই জমি অধিগ্রহণের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না, আর দেওয়া হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করার অর্থ হলো নিজেদের পৈতৃক জমির ওপর ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে বৈধতা দেওয়া।
জমি হারানোর এই বেদনা প্রকাশ করতে গিয়ে আবু মুদিফ বলেন, "আমার যদি এটি বর্ণনা করতে হয়, তবে সবচেয়ে কাছাকাছি বর্ণনা হবে এটি আপনার আত্মা কেড়ে নেওয়ার মতো। নিজের জমি ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনাও করতে পারি না।"
সেবাস্তিয়ার স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী নাহেদ সাখাও এখন উচ্ছেদের হুমকিতে রয়েছেন। তিনি জানান, হাজার বছরের প্রাচীন এই প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় রোমান, ক্রুসেডার, অটোমান এবং প্রাচীন ইহুদি ইতিহাসের বহু নিদর্শন রয়েছে। ইসরায়েলের মূল পরিকল্পনা হলো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি থেকে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। তিনি বলেন, "ইতিমধ্যেই খনন ও সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে এবং জমির মালিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে কেউ তাদের জমিতে প্রবেশ করতে বা চাষাবাদ করতে পারবেন না।"
সেবাস্তিয়া গ্রামের এই উদ্বেগ প্রতিধ্বনিত হয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর কণ্ঠেও। গত ২৫ জুলাই এক জরুরি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউনেস্কো সেবাস্তিয়াকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি এটিকে ‘ঝুঁকিতে থাকা বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে জমি অধিগ্রহণ এবং ‘সামারিয়া’ (শমরোন) জাতীয় উদ্যান তৈরির কারণে এই ঐতিহাসিক স্থানটি বিভক্ত হয়ে পড়ার বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।
সেবাস্তিয়ার মেয়র মোহাম্মদ আজেম জানান, রোমান যুগের ফোরাম এবং ব্যাসিলিকার ধ্বংসাবশেষের মধ্যবর্তী একটি পথ এই প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এর একপাশে রয়েছে এরিয়া-বি, যা ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসন এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের অধীন। অন্যপাশে রয়েছে এরিয়া-সি, যা সম্পূর্ণ ইসরায়েলি বেসামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মেয়র জানান, ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সাথে ঝামেলার ভয়ে স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা এখন প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের আবর্জনা পরিষ্কার করতেও ভয় পান।
পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে গত সপ্তাহে ইসরায়েল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর সম্প্রসারণে প্রায় ১১ কোটি ৩০ লাখ শেকেল (প্রায় ২৭.৮ মিলিয়ন পাউন্ড) বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা কিছু এলাকাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইসরায়েলি পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেবাস্তিয়ার মূল প্রবেশপথটি ফিলিস্তিনি গ্রাম, বর্তমান পার্কিং লট এবং দোকানপাট থেকে দূরে অন্য প্রান্তে সরিয়ে নেওয়া হবে।
ইসরায়েলের প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষা বিষয়ক অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ ‘এমক শাভে’-এর প্রধান অ্যালন আরাদ বলেন, ইসরায়েল স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সাথে কোনো আলোচনা না করেই এই কাজ করছে। তিনি বলেন, "আসল কথা হলো ইসরায়েল এই জায়গার মালিক নয়। এটি একটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী স্থান। এবং এটিকে ইতিবাচক উপায়ে উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় সম্প্রদায় ও পৌরসভার সাথে যৌথভাবে করতে হবে, যাতে তারা উপকৃত হতে পারে।"
ফিলিস্তিনের পর্যটন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি ইসরায়েলি জমি দখলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাতে সাহায্য করবে। তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার ইউনেস্কোর এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই সিদ্ধান্ত পশ্চিম তীরের সাথে ইহুদিদের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে অস্বীকার করার ফিলিস্তিনি প্রচেষ্টাকে মদদ দিচ্ছে। তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার ভোট ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারে না।"
সেবাস্তিয়ার পাশাপাশি জেরুজালেমের অদূরে অবস্থিত হেরোডিয়ামেও একই ধরনের জমি দখলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইসরায়েল। খ্রিস্টপূর্ব যুগে রাজা হেরোডের তৈরি ঐতিহাসিক প্রাসাদের এই স্থানে প্রায় ৮০ একর জমি সংরক্ষণের নামে অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘পিস নাও’ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, বসতি স্থাপন বা একচেটিয়াভাবে ইসরায়েলি নাগরিকদের সুবিধার জন্য জমি অধিগ্রহণ করা নিষিদ্ধ। সংস্থাটি আরও জানায়, এই অধিগ্রহণকে আইনি রূপ দিতে ইসরায়েল সরকার হয়তো দাবি করবে যে এই স্থানটি ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি উভয় জনগোষ্ঠীর জন্যই উন্মুক্ত থাকবে, যদিও এর আসল উদ্দেশ্য হলো বসতি সম্প্রসারণ ও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।































