হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট নিরসনে কোনো চুক্তির আশা ১০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে এসে ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ইরান ওয়াশিংটনের কাছে বড় ধরনের ছাড় দাবি করায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলার খবর এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি উপসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমবারের শুরুতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৯১ সেন্ট বেড়ে ৮৪.৪৬ ডলারে পৌঁছেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ৬১ সেন্ট। কৌশলগত এই জলপথটি পুনরায় কবে নাগাদ পুরোপুরি সচল হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই মূলত তেলের বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
ইরান জানিয়েছে যে ওমানের সাথে শিপিং লেন বা জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পথে। তবে তেহরানের দাবি, প্রণালীটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বৃহত্তর চুক্তি প্রয়োজন। এর আগে ইরান ওয়াশিংটনের কাছে ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দাবি করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দাদের জন্য এই সংকট সরাসরি বিমান চলাচল, জাহাজ পরিবহন, জ্বালানির দাম এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। সোমবারের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমানের কাছে হরমুজ প্রণালীতে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও এই তথ্যটি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে নির্দেশ করে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত এডনক (ADNOC) সংশ্লিষ্ট ১৫টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের বিপত্তিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। হাজার হাজার নাবিক বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকা পড়েছেন, কারণ জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে চলছে এবং সমুদ্রপথের ট্রাফিক স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এমিরেটস, ইতিহাদ, ফ্লাইদুবাই এবং এয়ার অ্যারাবিয়া তাদের ফ্লাইট সূচিতে পরিবর্তন বা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। যাত্রীদের বিমানবন্দর যাওয়ার আগে সরাসরি এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক এয়ারলাইনগুলো কিছু গন্তব্যে সেবা পুনরায় চালু করলেও, যাত্রীদের দীর্ঘ ভ্রমণ সময় এবং শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এয়ারলাইনগুলো এখনো এই অঞ্চলের আকাশসীমার কিছু অংশ এড়িয়ে চলার নীতি বজায় রাখছে, যা সামগ্রিক বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
আঞ্চলিক জোটের সমীকরণও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই চুক্তিটি সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়।
সংকট কেবল হরমুজ প্রণালীতে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সপ্তাহান্তে সৌদি আরবের জাজানে একটি তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে, যা আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর নতুন করে ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে।
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করে। এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা কেবল তেল রপ্তানি নয়, বরং জাহাজ চলাচল, বীমা, মালবাহী খরচ এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পরিস্থিতির কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দুবাই এবং আবুধাবি বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিমান ও লজিস্টিক হাব হিসেবে পরিচিত, আর দেশটির অর্থনীতি আঞ্চলিক জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওমান এমন কোনো সমঝোতা করতে পারবে কি না, যা হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক চলাচলকে বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত থেকে আলাদা করবে—তা এখন বড় প্রশ্ন। বাজারগুলো একদিকে সমঝোতার আশায় আশাবাদী, অন্যদিকে আলোচনার ব্যর্থতার আশঙ্কায় পুনরায় আতঙ্কিত হয়ে উঠছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দাদের জন্য মূল বার্তা হলো, হরমুজ নিয়ে কোনো চুক্তি হওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ফ্লাইট সূচি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বীমা কোম্পানি ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে, তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
সূত্র: গালফ নিউজ



























