ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন এই লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ৩১শে জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত ভোটারদের নিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কাজ চলছে। এই তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পরই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া সারা দেশে নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুতির জন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন, যার ফলে ডিসেম্বরের আগে নির্বাচন শুরু করা কঠিন হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দও রাখা হয়েছে এবং আগের মতোই নির্বাচনগুলো ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। সেই নির্বাচন শেষ হলেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কাজ শুরু হবে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিষয়ে কমিশনের সিনিয়র সচিব আকতার আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, ৩১শে জুলাই পর্যন্ত যারা নিবন্ধন করেছেন, তাদের তথ্য নিয়েই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করে তা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধি অনুমোদিত হয়েছে, যা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ২০১৬ সালের পুরনো বিধিমালার পরিবর্তে এবার নতুন করে এই আচরণবিধি প্রণয়ন করা হচ্ছে, যেখানে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আচরণবিধিতে পোস্টারের ব্যবহার বাদ দিয়ে ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রথমবারের মতো বিলবোর্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও এর আকার নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ব্যানারের সর্বোচ্চ আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল এ-ফোর সাইজ, ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং বিলবোর্ড সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট হতে পারবে। প্রচারসামগ্রী অবশ্যই সাদা-কালো রঙের হতে হবে এবং প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি হওয়া যাবে না। বিলবোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও স্তরভেদে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে; যেমন সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি, পৌরসভাতেও প্রতি ওয়ার্ডে একটি, উপজেলা নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২০টি এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা থাকছে। এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং প্রচারণার ব্যয় প্রার্থীর নির্বাচনী খরচের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের প্রচারণায় অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মেয়র, চেয়ারম্যান, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। প্রচারসামগ্রীতে প্রার্থীর ছবি ও নির্বাচনী প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না এবং জীবন্ত প্রাণী ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলে পলিথিন বা পিভিসি ব্যবহার করা যাবে না।
নতুন আচরণবিধিতে শাস্তির বিধানও কঠোর করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানার পরিমাণ ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রার্থিতা বাতিলের বিধানও রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের সময়ে দলীয় লোকজন নির্বাচিত হওয়ায় সরকার পতনের পর তাদের অনেকে পালিয়ে গেছেন বা আত্মগোপনে আছেন। অনেকে বিভিন্ন মামলার আসামি হয়েছেন। ফলে অনেক উপজেলা ও জেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পরিষদের বাড়তি দায়িত্ব পালন করছেন। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতেও প্রশাসক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২১শে জুন। ওইদিন বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার মোট ২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। এসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এখন নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র: মানবজমিন































