হাঙ্গেরির ভেলেন্স হ্রদের পানি রেকর্ড মাত্রায় নেমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে নৌকা চলাচল ও সাঁতার কাটার সৈকতগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপজুড়ে চলা তীব্র খরা ও দাবদাহের মধ্যে হাঙ্গেরির এই পানিসংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে কেবল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা নয়, বরং কয়েক প্রজন্ম ধরে দেশটির জলাভূমি শুকিয়ে ফেলার ভুল নীতিও দায়ী।
ভেলেন্স হ্রদের তীরে ছোট একটি বন্দরে নৌকা থেকে নামছিলেন ৫৮ বছর বয়সী জেলে সেলমেসি। পানি কমে যাওয়ায় ঘাটের কাঠের তক্তাটি খাড়া হয়ে উঠেছে, যা বেয়ে উঠতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল তাকে। শৈশব থেকেই এই হ্রদের পাড়ে বেড়ে ওঠা সেলমেসি বলেন, "আমি কখনো পানি এত নিচে নামতে দেখিনি। এটা ভয়াবহ। প্রতি মুহূর্তে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।"
এই গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্য থেকে শুরু করে গ্রিস পর্যন্ত পুরো ইউরোপ দাবদাহ ও দাবানলে পুড়ছে। হাঙ্গেরিতে তীব্র খরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। এমনকি দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
হাঙ্গেরির আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকা এখন তীব্র বা চরম খরার কবলে পড়েছে। পানির অভাবে গ্রেট হাঙ্গেরিয়ান প্লেইন বা সমভূমি অঞ্চলে মরুকরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অথচ হাঙ্গেরির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি ভূমি নিচু এলাকা, যা প্রাকৃতিকভাবেই বৃষ্টিপাত ধরে রাখতে পারে। একসময় নদী ও উপনদীতে সমৃদ্ধ এই দেশটিতে পানির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু ২০২৩ সালে 'নেচার' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাঙ্গেরি তার ঐতিহাসিক জলাভূমির ৮০ শতাংশেরও বেশি হারিয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ হাঙ্গেরি'-র জীববৈচিত্র্য নীতি বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্প সমন্বয়ক জুজানা উইজ বলেন, "গত ২০০ বছরে হাঙ্গেরি তার পানিসম্পদের সঠিক যত্ন নিতে পারেনি।" এর প্রধান কারণ হলো দেশটিতে থাকা ৪০ হাজার কিলোমিটারেরও (২৫,০০০ মাইল) বেশি দীর্ঘ ড্রেনেজ বা পানি নিষ্কাশন খাল। এই দৈর্ঘ্য পৃথিবীর পরিধির চেয়েও বেশি। কৃষিকাজ ও অন্যান্য ব্যবসার জায়গা তৈরি করতে এই খালগুলোর মাধ্যমে মাঠ, জলাভূমি ও মাটির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিকভাবে বন্যা বা পানি জমে থাকার সুযোগ না দিয়ে জমি শুকিয়ে ফেলার এই নীতির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে গেছে। বাষ্পীভবনের জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বাতাস শুষ্ক হয়ে পড়ছে, যা স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আরও কমিয়ে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাঙ্গেরি বিশ্বের ১৬তম এবং ইউরোপের অন্যতম খরাপ্রবণ দেশ। জুজানা উইজ মনে করেন, হাঙ্গেরির এখন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার পরিবর্তে পানি ধরে রাখার নীতিতে মনোনিবেশ করা উচিত।
মধ্যযুগ থেকে টিকে থাকা ভেলেন্স হ্রদটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে, সেখানে সব ধরনের বিনোদনমূলক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। হ্রদের তলদেশের বেশিরভাগ অংশ এখন উন্মুক্ত, ফাটল ধরা ও শুষ্ক। অবশিষ্ট পানি এতটাই অগভীর ও উষ্ণ হয়ে পড়েছে যে মাছসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ এই হ্রদে আর কোনো পানি অবশিষ্ট থাকবে না।
হ্রদের তীরে 'গ্লাস টাইগার' বার পরিচালনাকারী জোল্টান মেটনার বলেন, "পরিস্থিতি প্রতি বছর আরও খারাপ হচ্ছে। হ্রদটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচাতে আমরা যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারলাম না, তা সত্যিই দুঃখজনক।"
এই পরিস্থিতির মুখে হাঙ্গেরির নতুন সরকার নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত জুনের শেষে, যেদিন দেশের তাপমাত্রা রেকর্ড ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১০৭.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছায়, সেদিন প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগয়ার আইনপ্রণেতাদের জানান, সরকার পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে "নতুন ভিত্তির" ওপর দাঁড় করাবে এবং খরা মোকাবিলায় একটি ব্যাপক পানি সংরক্ষণ কর্মসূচি চালু করবে।
প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, জরাজীর্ণ পাইপলাইনের কারণে দেশের ২০-২৫ শতাংশ সুপেয় পানি অপচয় হয়, যার বার্ষিক ক্ষতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ফরিন্ট (৫ কোটি ৪৪ লাখ ডলার)। তিনি বলেন, "বহু বছর ধরে এই সমস্যার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হয়েছে। এখন থেকে পানি ধরে রাখাই হবে হাঙ্গেরির পানি ব্যবস্থাপনার মূল নীতি।"
তবে এই বিশাল পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এদিকে হাঙ্গেরির চলমান পানিসংকট দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। ইউরোপের দীর্ঘতম নদী দানিয়ুবের পানির স্তরও এ বছর রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। ফলে নদীটির পানি দিয়ে শীতল রাখা হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র 'পাকস' (Paks) ৪৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সরকার নদীর পানি ধরে রাখতে ৮০ মিটার (২৬২ ফুট) দীর্ঘ দুটি বার্জ ডুবিয়ে দিয়েছে এবং পাম্পের দিকে পানি প্রবাহিত করতে নদীগর্ভে বাঁধ তৈরির কাজ শুরু করেছে। জুজানা উইজ জানান, দানিয়ুবের মতো নদীর নিকটবর্তী জলাভূমিগুলো শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিকভাবে পানি ধরে রাখার কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকাল আরও শুষ্ক হবে এবং বৃষ্টিপাতের ধরন আরও চরম হবে, তাই জলাভূমি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি।





























