উজবেকিস্তানে সিরিলিক বর্ণমালা থেকে লাতিন বর্ণমালায় রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি দেশটির জাতিগঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে তাশখন্দ তাদের বর্ণমালা নীতি বহুবার সংশোধন করেছে। তবে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে সিরিলিক ও লাতিন উভয় বর্ণমালার সহাবস্থান বজায় রয়েছে। ২০২৩ সালের সর্বশেষ সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম ও দৈনন্দিন জীবনে সিরিলিক বর্ণমালা এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
১৯৯৩ সালের একটি আইনের মাধ্যমে এই বর্ণমালা পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এর অধীনে সরকার লাতিন বর্ণমালার নতুন বানানরীতি তৈরি করে এবং পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়। স্কুলগুলোতে লাতিন বর্ণমালায় পাঠদান শুরু হয়, নতুন পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা হয় এবং সরকারি নথিপত্র ও গণমাধ্যমে লাতিন বর্ণমালা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রমাণিত হয়েছে। প্রথমে ২০০০ সালের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ২০০৫ এবং পরবর্তীতে ২০১০ সাল করা হয়। কিন্তু কোনো সময়সীমাতেই এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
২০১৬ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট শভকত মির্জিওয়েভের ক্ষমতা গ্রহণের পর এই সংস্কার প্রক্রিয়া নতুন গতি পায়। ২০১৯ সালে 'স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট' এবং ২০২০ সালে 'উজবেক ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' গঠন করা হয়, যা সরকারি সংস্থাগুলোতে লাতিন বর্ণমালার ব্যবহার মানসম্মত করার কাজ শুরু করে। সমরখন্দ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মাঠপর্যায়ে গবেষণার সময় দেখা গেছে, ৩৫ বছর বয়সী তরুণ গবেষক থেকে শুরু করে ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকরাও এই নতুন বর্ণমালা শেখার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। একজন প্রবীণ শিক্ষাবিদ বলেন, "ইলম অলিশ উচুন হেচ কাচন কেচ ইমাস" অর্থাৎ "শেখার কোনো বয়স নেই", যা সরকারের এই রূপকল্পের প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রকাশ করে।
তবে দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তন করা সহজ নয়। বুখারা স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সায়লিয়েভা রাখমিদ্দিনোভা জানান, সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে সিরিলিক বর্ণমালা কেবল একটি লিখন পদ্ধতি নয়, বরং জীবনযাপনের একটি প্রধান হাতিয়ার ছিল। ফিলোলজি বিষয়ের শিক্ষক শোহিস্তা আকরামোভা উল্লেখ করেন, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্মচারীদের বড় অংশ সিরিলিক বর্ণমালায় শিক্ষিত হওয়ায় দাপ্তরিক যোগাযোগে এখনও সিরিলিকই তাদের স্বাভাবিক পছন্দ। এছাড়া সরকারি দপ্তরের সফটওয়্যার ও আর্কাইভিং মানদণ্ডগুলো মূলত সিরিলিক বর্ণমালার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক উলুগবেক মির্জোখিদোভের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ গবেষণামূলক ও একাডেমিক বই এখনও সিরিলিকে লেখা। ফলে লাতিন বর্ণমালায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম যদি সিরিলিক পড়তে না পারে, তবে তারা তাদের ইতিহাস ও পেশাদার গভীরতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
উজবেকিস্তানের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে এবং তারা মূলত লাতিন বর্ণমালায় শিক্ষিত। কিন্তু প্রশাসনের মূল দায়িত্বে থাকা মধ্যবয়সী প্রজন্ম সোভিয়েত আমলে তাদের পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেছেন। এই পার্থক্যের কারণে এক ধরনের "খণ্ডিত সাক্ষরতা" তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট। সরকারি গণমাধ্যমগুলো উভয় বর্ণমালা ব্যবহার করলেও বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থা ও সংবাদপত্রগুলো বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে সিরিলিক বর্ণমালাতেই অনড় রয়েছে, কারণ তাদের পাঠকসংখ্যা বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কমরনবেক ইসরোইলভের মতে, এই পরিস্থিতি তরুণ প্রজন্মের পড়ার অভ্যাসকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
লাতিন বর্ণমালায় সম্পূর্ণ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বড় একটি বাস্তব বাধা হলো রাশিয়ার ওপর উজবেকিস্তানের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। ২০২১ সালের রুশ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ লাখ উজবেক নাগরিক রাশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে নিবন্ধিত ছিলেন। এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের চাকরি, আবাসন ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য রুশ ভাষা এবং সিরিলিক বর্ণমালা জানা অত্যন্ত জরুরি। ২০২৪ সালে উজবেকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ১১.৫ বিলিয়ন ডলারই (৭৭ শতাংশ) এসেছে রাশিয়া থেকে। ফলে অর্থনৈতিক কারণেই সিরিলিক বর্ণমালার সামাজিক কার্যকারিতা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী।
উজবেকিস্তানের এই বর্ণমালা সংস্কার রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমে তীব্র ভূরাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মস্কো এটিকে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখে। 'স্ট্র্যাটেজিক কালচার ফাউন্ডেশন'-এর মতো গণমাধ্যমগুলো তাশখন্দের এই পদক্ষেপকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট একটি "সাংস্কৃতিক বিভেদ" হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাশিয়ার রিয়াজান-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউরি মোস্তিয়ায়েভ ২০২৫ সালে সতর্ক করে বলেছিলেন, এই ধরনের ভাষাগত সংস্কার রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বাধা তৈরি করছে এবং ইউক্রেনের মতো একটি রুশ-বিরোধী রাজনৈতিক গতিপথ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিশ্লেষক আন্তোয়ান গিওরি মনে করেন, এই রূপান্তরকে তুর্কি সফট পাওয়ারের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যার লক্ষ্য তুর্কিভাষী দেশগুলোকে একটি অভিন্ন ভাষাগত মডেলে ঐক্যবদ্ধ করা। প্রেসিডেন্ট মির্জিওয়েভ এই সংস্কারের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী অবস্থান বজায় রাখছেন, অন্যদিকে মস্কোকে আশ্বস্ত করছেন যে রুশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান বজায় থাকবে।
উজবেকিস্তানের এই বর্ণমালা সংস্কারের ধীরগতিকে ব্যর্থতা বলা চলে না, কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। পুরো শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর, বই পুনর্মুদ্রণ এবং সরকারি সফটওয়্যার আপডেট করার ব্যয় অনেক বেশি। তাছাড়া তাশখন্দের কাছে অর্থনৈতিক সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, পানি সম্পদ বণ্টন এবং আফগানিস্তান সীমান্ত সুরক্ষার মতো আরও জরুরি নীতিগত অগ্রাধিকার রয়েছে। তবে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে সরকারকে কেবল আইন প্রণয়নের বাইরে গিয়ে সিরিলিক আর্কাইভগুলোর ডিজিটালাইজেশন এবং লাতিন বর্ণমালার ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় শিল্পে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতে হবে।




























