যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে নিজেদের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। দেশটির নতুন নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজাই মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন যতক্ষণ না যুদ্ধ ও অবরোধ বন্ধ করছে, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দিচ্ছে এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হচ্ছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা হবে না।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এই যুদ্ধকালীন কমান্ডার-ইন-চিফ জোর দিয়ে বলেছেন, সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ থাকবে। তার এই বক্তব্য ইরানের পূর্ববর্তী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তেহরান বারবার দাবি করে আসছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম।
মঙ্গলবার তেহরানে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত কং পেইউয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক করেন রেজাই। এটি ছিল সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। বৈঠকে তিনি চীনের সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এছাড়া জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনা প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় বেইজিংয়ের প্রশংসা করেন তিনি। ওমানের সাথে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কোনো সম্ভাব্য চুক্তি ওয়াশিংটনের সাথে চলমান সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ওমানের সাথে এমন কোনো চুক্তির বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। হরমুজ প্রণালী, লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার রেজাইয়ের নিয়োগ ঘোষণার রাতেই ওমান উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মঙ্গলবার লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথিদের হামলায় মিশরীয় মালিকানাধীন একটি জাহাজে ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে তারা লোহিত সাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর করার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ১২টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় এক মাস ধরে এই অবরোধ পুনরায় শুরু হয়েছে।
আগামী সপ্তাহে সেই সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানের পথে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা অব্যাহত রয়েছে। আইআরজিসি সতর্ক করেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যদি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বেসামরিক অবকাঠামোতে আরও হামলা চালায়, তবে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বুধবার হুমকি দিয়ে বলেন, ইরানকে পুনরায় হুমকি দেওয়া হলে বিশ্বের হাজার হাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি লাইন এবং ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত বৈশ্বিক অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়বে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের আগে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ থেকে ৪০টি যুদ্ধজাহাজ থাকলেও বর্তমানে একটিও নেই। পেন্টাগনের অস্ত্রাগারে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ কমে আসাকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
আইআরজিসি প্রধানের উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি দাবি করেছেন, যুদ্ধের মধ্যেও ইরান দেশীয় প্রযুক্তিতে তাদের ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ কয়েক বছর চললেও তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শত্রুর ওপর আঘাত হানতে থাকবে।
এদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল এনেছেন। হোসেইন তায়েবকে বাসিজ ফোর্সের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আলী আবদোল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার এক ভাষণে স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান যুদ্ধ আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং শত্রুরা দেশের ভেতর থেকে পতন ঘটানোর চেষ্টা করছে। তিনি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও জনঅসন্তোষের দিকে ইঙ্গিত করেন।
ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশের সীমান্ত পুলিশ প্রধান আলী আকবর জাভিদান বুধবার ইরাকভিত্তিক কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্থল হামলার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকে ‘ভ্রান্ত’ বলে অভিহিত করে জানিয়েছেন, সীমান্ত রক্ষীদের সতর্কতায় দেশের সীমানা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য রয়েছে।
তবে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে স্পষ্ট। তেহরানের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী জামশিদ আল জাজিরাকে বলেন, পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে তিনি আর কোনো পূর্বাভাস দিতে পারছেন না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই অনিশ্চয়তা আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে এবং দেশের যুবসমাজ এই পরিস্থিতির কারণে চরম সংকটে পড়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা




























