পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে কাজ করছে সরকার। যাতায়াত ও অবকাঠামোগত নানা সংকটের মধ্যেও ই-লার্নিং বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে পাহাড়ের শিশুরা এখন শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে কঠিন বিষয়গুলো শেখার সুযোগ পাচ্ছে। তিন পার্বত্য জেলার নির্বাচিত ১২টি বিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে ডিজিটাল শিক্ষাক্রমের এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার তিনটি প্রাথমিক ও নয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই ই-লার্নিং কার্যক্রম চালু করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পর্যায়ক্রমে দ্রুত সময়ের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলার নির্বাচিত মোট ১৪৯টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া চলছে।
বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির ৫৫০টি বিদ্যালয়ে টেলিভিশন ও মাল্টিমিডিয়া সংযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, দুর্গম অঞ্চল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকটের কারণে এসব এলাকায় প্রায়ই সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ থাকে না। একই কারণে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা সেখানে যেতে চান না। কারণ প্রত্যন্ত এলাকায় গেলে তাদের দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। তবে ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষকরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই শিক্ষার্থীদের সরাসরি পড়াতে পারছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে।
পাহাড়ের অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা থাকায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট—স্টারলিংক বা সমজাতীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো শেখানো হচ্ছে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
পদ্ধতিটি নতুন হওয়ায় মানুষের আস্থা অর্জনে কাজ করছে বিভিন্ন ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। এ প্রসঙ্গে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিখোর সহপ্রতিষ্ঠাতা জিশান জাকারিয়া বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাসের জায়গা এখনও পুরোপুরি শক্ত হয়নি। এই সমস্যা সমাধানে শিখো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করছে, যেখানে ই-লার্নিংয়ের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়।
অনলাইন শিক্ষার কার্যকারিতা সম্পর্কে ই-ক্যাবের অ্যাড-টেক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে অভিভাবকেরা সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। শিক্ষার্থী কত সময় পড়াশোনা করছে এবং তার ফলাফল কেমন হচ্ছে—তা সহজেই যাচাই করা যায় বলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবকদের নজরদারির সুযোগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, শিক্ষার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নও জরুরি। এ জন্য ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং কফি, কাজুবাদাম ও ড্রাগন ফলের মতো উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
যথাযথ ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ই-লার্নিংয়ের এই উদ্যোগ পাহাড়ের শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে এবং সমতল ও পাহাড়ের শিক্ষার ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
































