অধিকৃত পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা তিনটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে পরিবারগুলো পানি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের জমি দখলের উদ্দেশ্যেই এই পরিকল্পিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
নাভলুসের দক্ষিণে অবস্থিত কুসরা গ্রামের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে বুধবার দেখা গেছে, একদল বসতি স্থাপনকারী একটি বাড়ি ঘিরে রেখেছেন। অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, ইসরায়েলি সেনারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েও বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সেনাদের বসতি স্থাপনকারীদের সাথে প্রার্থনা করতেও দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবরুদ্ধ পরিবারের সদস্য আয়েশা আবু রিদা আল জাজিরাকে জানান, রবিবার থেকে তাদের বাড়ির সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমরা বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত, কিন্তু আমরা অটল। পানি ও বিদ্যুৎ না থাকলেও আমরা আমাদের ঘর ছাড়ব না। আমাদের উচ্ছেদের জন্য বারবার আক্রমণ চালানো হলেও আমরা শহীদ হওয়া পর্যন্ত আমাদের বাড়িতেই থাকব।”
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত লোয়াই রিদি জানান, তার ভাই কুসাই আবু রিদা এবং ১৮ বছর বয়সী ভাতিজা আহমেদ অবরুদ্ধদের মধ্যে রয়েছেন। তারা বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ এবং শীতকালের জমানো কূপের পানি ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কুসাই জানিয়েছেন, তাদের কাছে মাত্র দুই থেকে তিন দিনের খাবার অবশিষ্ট আছে।
তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, কুসরার মেয়রকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে এই সামরিক অভিযান রবিবার সকাল পর্যন্ত চলতে পারে। বুধবার অতিরিক্ত ইসরায়েলি বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বসতি স্থাপনকারীদের একটি তাবু সরিয়ে নিলেও তাদের পুরোপুরি উচ্ছেদে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পরে জানিয়েছে, তারা ওই এলাকায় একটি অতিরিক্ত পদাতিক ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করবে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করবে। এর আগে তারা বসতি স্থাপনকারীদের এই কর্মকাণ্ডকে ‘অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করে এবং জড়িত সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
কুসরা গ্রামটি পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া বি’-তে অবস্থিত, যা প্রশাসনিকভাবে ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। গত মাসে এই গ্রামে একটি নতুন মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া জুলাই মাসে পার্শ্ববর্তী জালুদ গ্রামে দুই সপ্তাহের অবরোধের পর ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে তাদের জমি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ১৮ শিশুসহ ৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, উচ্ছেদ ও বাড়িঘর ধ্বংসের কারণে প্রায় ৩,৮০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার ডেপুটি স্পেশাল কোঅর্ডিনেটর রামিস আলাকবারভ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, চলতি বছর ফিলিস্তিনিদের ওপর ১,৪৩০টিরও বেশি বসতি স্থাপনকারী হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব হামলায় হতাহত ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আলাকবারভ আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এ বছর পশ্চিম তীরে প্রায় ১২,৩৬০টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে ৫,১৬০টি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব পদক্ষেপ পশ্চিম তীরের ভূ-প্রকৃতি বদলে দিচ্ছে এবং ফিলিস্তিনি শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে কার্যত দখলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৫ লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছেন, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। ইসরায়েলি অধিকার গোষ্ঠী ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর সরাসরি সমর্থন ছাড়া বসতি স্থাপনকারীদের এই নিয়মিত সন্ত্রাস ও জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো সম্ভব হতো না।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরের বর্তমান পরিস্থিতি একটি ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’ বা চরম সীমায় পৌঁছেছে। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী সংস্থা ‘পিস নাও’-এর তথ্যমতে, পশ্চিম তীরে বর্তমানে ১৪৬টি অবৈধ বসতি এবং ৩৯০টি ছোট ফাঁড়ি রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা




























