কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক জেসন আরডে লন্ডনে মারা গেছেন। গবেষণায় জালিয়াতি ও জীবনবৃত্তান্তে তথ্য বিকৃতির অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করার মাত্র এক সপ্তাহ পর তার এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর এলো। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪১ বছর।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা ৩টা ১২ মিনিটে একটি বাড়ি থেকে এক ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের খবর পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে যান। ঘটনাস্থলেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পুলিশ সরাসরি আরডের নাম উল্লেখ না করলেও জানিয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির বয়স ৪১ বছর এবং তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মৃত্যু অপ্রত্যাশিত হলেও তা সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে না। ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
আরডের আকস্মিক প্রয়াণে তার পরিবার গভীর শোক প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জেসন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তার বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত ও অবিরাম লাঞ্ছনার প্রচার চালানো হচ্ছিল। কিছু মানুষ তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেনি। পরিবার আরও জানায়, এই বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার জেসনের জন্য সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল, কারণ তিনি অত্যন্ত বিনয়ী একজন মানুষ ছিলেন এবং সবসময় সবার ভালোটাই দেখতেন। এমন একজন চমৎকার বাবা, সঙ্গী, ভাই, চাচা ও সন্তানকে হারিয়ে তারা স্তব্ধ হয়ে গেছেন।
যুক্তরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরডের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই অত্যন্ত দুঃখজনক সময়ে আরডের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা রইল। আমি সবাইকে এই কঠিন সময়ে তাদের গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখার এবং এটি মনে রাখার অনুরোধ করছি যে এর পেছনে কিছু রক্তমাংসের মানুষ ও তাদের প্রিয়জনরা জড়িয়ে আছেন।
গত ৫ আগস্ট আরডে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেন। তার জীবনবৃত্তান্ত এবং একাডেমিক কাজে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। পদত্যাগের সময় এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, অবিরাম অভিযোগ, জল্পনা-কল্পনা এবং জনসাধারণের মন্তব্য আমার ও আমার প্রিয়জনদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার পদত্যাগকে যেন কোনোভাবেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য না করা হয়। তিনি আরও বলেন, এটি কেবল এমন একজনের সিদ্ধান্ত, যিনি সহ্য করার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর ডেবোরা প্রেন্টিস এক বিবৃতিতে বলেন, এই মর্মান্তিক খবর শুনে আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। জেসন আরডের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা।
জেসন আরডে ২০২৩ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে যুক্তরাজ্যের অন্যতম আলোচিত শিক্ষাবিদে পরিণত হন। তার জীবনের এক অসাধারণ লড়াইয়ের গল্প অনেকের অনুপ্রেরণা ছিল। তিনি অটিজম ও ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ১১ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কথা বলতে পারতেন না এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তে বা লিখতে পারতেন না। দক্ষিণ লন্ডনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আরডে শিক্ষা ও শারীরিক শিক্ষায় স্নাতক এবং দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
২০২৩ সালে আরডে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, স্কুলের খুব বেশি শিক্ষক আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারেননি। শিক্ষাবিদ ও আচরণগত থেরাপিস্টরা জোর দিয়ে বলেছিলেন যে আমি পরবর্তীতে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হব এবং আমার অন্যের সাহায্য নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
গত মাসে আরডের বিরুদ্ধে প্রথম গবেষণায় জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন নাথান কফনাস নামের এক জীববিজ্ঞানের দার্শনিক ও কেমব্রিজের সাবেক গবেষক। কফনাস বৈচিত্র্য, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি (DEI) নীতির তীব্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তিনি এর আগে লিখেছিলেন যে, মেধার ভিত্তিতে বিচার করা হলে ক্রীড়া ও বিনোদন জগৎ ছাড়া অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের পদ থেকে কৃষ্ণাঙ্গরা অদৃশ্য হয়ে যাবে।
আরডে অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, তার একাডেমিক কাজে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত ছিল। এই সমালোচনাকে তিনি বর্ণবাদী ও আদর্শগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবে বর্ণনা করেন। তার সমর্থকরাও মনে করেন, বর্ণবাদ, বৈষম্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
দ্য টাইমস অব লন্ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি আরডের ডক্টরাল থিসিস নিয়ে তদন্ত করে কোনো একাডেমিক অসদাচরণের প্রমাণ পায়নি। তবে দ্য টাইমস এবং দ্য টেলিগ্রাফ তার ব্যক্তিগত ইতিহাসের কিছু তথ্য, যেমন দাতব্য কাজের জন্য লাখ লাখ টাকা সংগ্রহের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যা পরে তিনি সংশোধন করেছিলেন। দ্য টেলিগ্রাফ তার লেখা একটি বইয়ের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। তার আত্মজীবনী 'গ্রেট অ্যান্ড আনফরচুনেট থিংস' প্রকাশের ঠিক আগে এই সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করে।






























