এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের জৌলুস বাড়াতে এবং শতভাগ পাসের হার ও জিপিএ-৫ এর সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে দেশের বেশ কিছু নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূত কৌশল অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান দশম শ্রেণির নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে কেবল ভালো জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরই বোর্ড পরীক্ষার ফরম পূরণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, যা শিক্ষা বোর্ডের নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এই অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল, রেজিস্ট্রেশন এবং ফরম পূরণের যাবতীয় নথিপত্র তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সশরীরে বোর্ডে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষার আগে নির্বাচনী পরীক্ষা নেওয়া হয় মূলত শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য। টেস্ট পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও কেবল কাঙ্ক্ষিত জিপিএ না পাওয়ার অজুহাতে ফরম পূরণে বাধা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার প্রতিষ্ঠানের নেই। বোর্ডের পরীক্ষা পরিচালনা-সংক্রান্ত বিধান ও বাৎসরিক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে কোনো শিক্ষার্থী যদি টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয় কিংবা বোর্ডের অন্যান্য আবশ্যক যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবেই তাকে ফরম পূরণ থেকে বিরত রাখা যেতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের কিছু নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোর্ড পরীক্ষার আগে এক ধরনের বাছাই প্রক্রিয়া চলে। টেস্ট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ডেকে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীকে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে টেস্ট পরীক্ষার পর এমন কোনো বাছাই প্রক্রিয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৩৭৬ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে ৬ জনসহ মোট ৩৮২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছরও প্রতিষ্ঠানটির ৩২০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শতভাগ জিপিএ-৫ পেয়েছিল। তবে চলতি বছরের ফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটিতে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কিছু শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা বোর্ড ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। কোন শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছে, কারা উত্তীর্ণ হয়েছে, কতজনের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে এবং কারা ফরম পূরণ করেনি—এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের ফরম পূরণ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।
তবে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন শিক্ষার্থীদের জিপিএ-র ভিত্তিতে বাছাইয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, সরকারি নির্দেশনা ও বোর্ডের পরিপত্র মেনেই টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে টেস্ট পরীক্ষায় এ-প্লাস না পেলে ফরম পূরণ করতে না দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদেরই ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কেউ প্রমাণ করতে পারলে আমরা যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব।’
প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের টেস্ট পরীক্ষায় তাদের মোট ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮২ জন পাস করেছে এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। যারা পাস করেছে তাদের ফরম পূরণ করা হয়েছে, আর যারা অকৃতকার্য হয়েছে তাদের ফরম পূরণ করা হয়নি। তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির ভালো ফলাফলের পেছনে কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত ক্লাস এবং প্রতি ১২ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে গাইড শিক্ষক রাখার মতো নিবিড় তত্ত্বাবধান পদ্ধতি কাজ করেছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করার পরও শুধু এ-প্লাস না পাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা অন্যায়। তিনি দাবি করেন, এ ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কোনো শিক্ষার্থী যেন এ ধরনের হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডকে নিয়মিত নজরদারি করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক প্রফেসর ড. মো. মাসুদ রানা খান জানান, বিষয়টি বোর্ডের নজরে এসেছে এবং প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ জিপিএ-৫ পেয়েছে, উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানকেই চিঠি দিয়ে ডাকা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল এবং ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যানের নির্দেশেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়ে ডাকা হচ্ছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হবে।
টেস্ট পরীক্ষায় এ-প্লাস না পেলে ফরম পূরণ করতে না দেওয়ার বিষয়ে বোর্ডের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি বোর্ড খতিয়ে দেখছে। তদন্ত শেষে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
জিপিএ-৫ বেশি দেখাতে ‘বাছাইয়ের’ অভিযোগ
শতভাগ জিপিএ-৫-এর নেপথ্যে কী, উত্তর খুঁজছে বোর্ড
এর আগের বছরগুলোতেও প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের পর অতিরিক্ত সময় ধরে পড়ানো হয়।
পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেওয়া এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘ওনাদের তথ্য পাঠাতে বলেছি।
সূত্র: Dhaka Post






























