এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শতভাগ পাশের হার ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। তবে এই ঝকঝকে ফলাফলের আড়ালে অনেক প্রতিষ্ঠানেরই ভিন্ন এক নির্মম চিত্র বেরিয়ে আসছে। অভিযোগ উঠেছে যে, শতভাগ পাশের হার বজায় রাখার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে অনেক নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।
ঢাকা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধিত ৬১৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৩৮২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ ২৩৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেনি। অথচ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বোর্ড ফলাফলে শীর্ষস্থান দখল করে আসছে এবং ২০২৫, ২০২২, ২০১৭ ও ২০১৫ সালেও এই প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ছিল ১০০ শতাংশ। একইভাবে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ১ হাজার ৯৯১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৪৪০ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, ফলে ৫৫১ জন শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয়েছে। মোহাম্মদপুরের মাইলস্টোন ক্যাম্পাসেও ২০৪ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ জন পরীক্ষা দিতে পারেনি।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ২ হাজার ১৩৪ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ জন, মনিপুর স্কুলের ৩ হাজার ৪৯০ জনের মধ্যে ১৩১ জন এবং মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ২ হাজার ৭৭০ জনের মধ্যে ৪৮ জন (ফরম পূরণ করেছে ২ হাজার ৭২২ জন) পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এছাড়া মাইলস্টোন কলেজ থেকে বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনে মোট ১৪৯৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৪৮৮ জন, যেখানে পাশের হার ৯৯.৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬১৩ জন শিক্ষার্থী।
এ বিষয়ে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর অভিভাবকদের দাবির প্রেক্ষিতে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, যেখানে অনেকে উত্তীর্ণ হতে না পারায় ফরম পূরণ করতে পারেনি। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল জানান, এ বিষয়ে সঠিক তথ্য তাদের কাছে নেই, তবে শতভাগ পাশের জন্য কোনো শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, শতভাগ পাশের হার দেখানোর জন্য কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তিনি জানান, অতীতে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। সন্তোষজনক উত্তর না পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শিক্ষার মান বুঝতে হলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, পাশের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার—সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শুধু পাশের হার দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা ঠিক নয়, কারণ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।
নরসিংদী নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে ২৩৪ ও মাইলস্টোনে ৬২১ জন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি * শতভাগ পাশের হার দেখানোর জন্য এক শ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে -চেয়ারম্যান, ঢাকা বোর্ড
রাজধানীসহ কয়েকটি নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার জন্য কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ও ফরম পূরণকারী পরীক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।




























