সিরিয়ার নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশটির সাথে তুরস্কের সীমান্তের প্রধান নিরাপত্তা হুমকিগুলো দূর হয়েছে বলে জানিয়েছেন দামেস্কে নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূত নুহ ইলমাজ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার "সিরিয়া নাও" অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি আঙ্কারা ও দামেস্কের মধ্যকার কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক নানা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন যে, দামেস্কে অবস্থিত তুরস্কের কূটনৈতিক মিশনটি বিশ্বের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় মিশন, যা দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিরই বহিঃপ্রকাশ।
তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যকার গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ইলমাজ বলেন, তুর্কি জনগণের জাতীয় স্মৃতিতে দামেস্কের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই এই শহরটি "শাম আল-শরিফ" নামে পরিচিত এবং উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে সেলজুক যুগ পর্যন্ত এর রয়েছে এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। উমাইয়াদ মসজিদের আজান থেকে শুরু করে দুই দেশের যৌথ ঐতিহ্য—সবখানেই তুর্কি সংস্কৃতির এক গভীর ছাপ আজও স্পষ্ট।
দুই দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সামরিক যোগাযোগের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তুর্কি রাষ্ট্রদূত প্রেসিডেন্ট রেজেপ তায়িপ এরদোয়ানের সেই নীতি স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে তিনি বলেছিলেন—"সিরিয়ার নিরাপত্তা মানেই তুরস্কের নিরাপত্তা"। ইলমাজ জানান, সিরিয়ায় নতুন প্রশাসন আসার পর সীমান্তের প্রধান কৌশলগত নিরাপত্তা সমস্যাগুলো কেটে গেছে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বরের পর থেকে সীমান্তে মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন এবং সন্ত্রাসবাদের মতো চারটি বড় কৌশলগত সমস্যা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, লাতাকিয়া বন্দরে সম্প্রতি তুর্কি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের সফরটি আগামী দিনে সামরিক ও সামুদ্রিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার একটি বড় প্রমাণ। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম এবং লজিস্টিক চাহিদা পূরণে তুরস্ক পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত রয়েছে।
আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে তুরস্কের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, পিকেকে, ওয়াইপিজি এবং এসডিএফ-কে এই অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে হবে। সিরিয়া সরকার ও ওয়াইপিজির মধ্যকার প্রক্রিয়াটি আঙ্কারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তুরস্ক, সিরিয়া এবং ইরাক থেকে পিকেকে ও এসডিএফ-এর মতো উপাদানগুলোর সম্পূর্ণ অবসান জরুরি। তিনি বলেন, তুরস্ক কেবল নিজের দেশেই নয়, বরং পুরো অঞ্চলেই সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ দেখতে চায়। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা যেমনটি বলেছেন, একীভূতকরণের প্রক্রিয়াটি কিছুটা ধীরগতির হলেও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে নেওয়া সব ধরনের পদক্ষেপকে তুরস্ক সমর্থন করে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ স্বল্প সময়ের মধ্যে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার মধ্যমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং যৌথ শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্তের সবকটি পারাপার পয়েন্ট পুনরায় খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে তুরস্ক। তুর্কি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সিরিয়ার শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে সীমান্ত পারাপারগুলো, বিশেষ করে নুসাইবিন-কামিশলি রুটটি চালু করা সম্ভব হবে। এছাড়া ইদলিবে একটি মুক্ত অঞ্চল এবং ড্রাই পোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা পরিবহন ও শুল্ক প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে ইলমাজ জানান, তুরস্কের জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সিরিয়ার কর্তৃপক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, আগামী দিনে দামেস্ক ও এর আশপাশের এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক তুর্কি স্কুল খোলা হবে। এছাড়া তুরস্কে সাময়িক সুরক্ষায় থাকা সিরীয় নাগরিকদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই কাজের অনুমতির বাধ্যবাধকতা শিথিল রাখা হয়েছে। যেসব সিরীয় নাগরিক নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন, তারা যাতে পরবর্তীতে সহজেই তুরস্কে যাতায়াত করতে পারেন, সেজন্য তুরস্কের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি নতুন ভিসা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রাষ্ট্রদূত বলেন, এমন একটি সফরের আকাঙ্ক্ষা সবসময়ই রয়েছে। দামেস্ক এবং উমাইয়াদ মসজিদের প্রতি প্রেসিডেন্টের গভীর অনুরাগ রয়েছে। পূর্বে পরিকল্পিত কিছু যোগাযোগ আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে স্থগিত হয়েছিল। তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে দামেস্কে দেখার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, উমাইয়াদ মসজিদে এরদোয়ান এবং প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার একসঙ্গে হাঁটার একটি ঐতিহাসিক ছবি পুরো বিশ্বকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের শক্তির বার্তা দেবে।




























