গত জানুয়ারিতে একটি চিঠি পেয়েছিলেন এক তরুণী। সাধারণ বিল বা বিজ্ঞপ্তির ভিড়ে সেই চিঠিটি ছিল একেবারেই আলাদা। খামটি ছিল বেশ ভারী, ডাকটিকিট ছিল প্যারিসের এবং সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, খামের ওপরের আঁকাবাঁকা হাতের লেখাটি ছিল খোদ তাঁর নিজেরই।
এক বছর আগে প্যারিস ভ্রমণের সময় একটি 'লেটার-রাইটিং ক্যাফে' বা চিঠি লেখার ক্যাফেতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে নিয়ম ছিল সহজ—নিজেকে বা অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে জমা দিতে হবে, যা ঠিক এক বছর পর ক্যাফে কর্তৃপক্ষ পোস্ট করে দেবে। ফরাসি খাবার 'এসকারগো' প্রথমবার চেখে দেখার পাশাপাশি তিনি নিজের ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে কিছু সাধারণ প্রশ্ন লিখেছিলেন—ভবিষ্যতে তিনি কী করবেন, কোথায় থাকবেন বা তাঁর কোনো প্রেমিক থাকবে কি না। লন্ডনের ঠিকানায় পাঠানো সেই চিঠিটি যখন এক বছর পর তাঁর হাতে পৌঁছায়, তখন সেটি তাঁর কাছে এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি বয়ে আনে। এটি ছিল যেন তাঁর অতীত ভাবনার এক জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল।
এই ঘটনাটি তাঁর জীবনযাপনের ধরন বদলে দেয়। তিনি অন্যদেরও চিঠি লেখা শুরু করেন। লন্ডন থেকে স্পেনের মাদ্রিদে স্থানান্তরিত হওয়ার পর তিনি প্রতি মাসে তাঁর মাকে চিঠি লিখতে শুরু করেন। চিঠির সঙ্গে জুড়ে দিতেন জাদুঘর বা গ্যালারির টিকিট, কিংবা মাত্র ৪০ পেন্সে কেনা পাকা অ্যাভোকাডোর রসিদ। প্রতি সপ্তাহে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হলেও চিঠির পাতায় তিনি এমন অনেক কিছু লিখতে পারতেন, যা সচরাচর ফোনে বলা হতো না। যেমন—মাদ্রিদের মানুষ কত ধীরগতিতে হাঁটে, তা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তিনি চিঠিতেই ফুটিয়ে তুলতেন।
ধীরে ধীরে চিঠি লেখার এই অভ্যাস আরও বেড়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার তিনি পোস্ট অফিসের লাইনে দাঁড়াতেন বোন, দেশের বন্ধু বা ছোট কাজিনদের চিঠি পাঠানোর জন্য। সবাই ফিরতি চিঠি না লিখলেও, চিঠি পাঠানোর এই প্রক্রিয়াটি তাঁর মনের ওপর এক ধরনের থেরাপির মতো কাজ করত। কাগজের ওপর কলমের স্পর্শ বা খাম আঠা দিয়ে আটকানোর স্বাদ ফেসটাইম কল বা পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মেসেজে পাওয়া অসম্ভব। এর ফলে সারাক্ষণ অনলাইনে যোগাযোগ রাখার তাগিদও তাঁর কমে আসতে থাকে।
চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি ফিরতি চিঠির অপেক্ষার মধ্যেও ছিল এক অন্যরকম আনন্দ। অন্যের হাতের লেখায় নিজের নাম লেখা ভারী খামটি হাতে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ফ্ল্যাটে ওঠার সময় তিনি কল্পনা করতেন ভেতরে কী লেখা থাকতে পারে। ডেস্কে বসে প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া, কলমের কালি ফুরিয়ে যাওয়া বা কেটে দেওয়া শব্দের মতো ছোটখাটো বিষয়গুলোও তাঁকে আনন্দ দিত। ডিজিটাল মেসেজের মতো চিঠিতে দ্রুত উত্তর দেওয়ার তাড়া থাকে না, বরং এটি মানুষকে ধীরস্থিরভাবে চিন্তা করতে শেখায়।
চিঠি লেখার এই অভ্যাস তাঁর ডিজিটাল জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি পুরোপুরি ফোন ব্যবহার বন্ধ করেননি, তবে এখন আর আগের মতো সব সময় অনলাইনে থাকার তাগিদ অনুভব করেন না। কিছু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ মিউট করেছেন, কিছু আর্কাইভ করেছেন। তাৎক্ষণিক রিপ্লাই না দিতে পারলে যে অস্থিরতা হতো, তা এখন কেটে গেছে। মেসেজে দীর্ঘ আলাপ না বাড়িয়ে তিনি এখন সরাসরি ফোন করতেই বেশি পছন্দ করেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি আবারও লন্ডনের শৈশবের বাড়ির ঠিকানায় নিজেকে উদ্দেশ্য করে আরেকটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এক বছর পর সেই চিঠি যখন তাঁর হাতে পৌঁছাবে, তখন নিজেকে তিনি চিনতে পারবেন কি না, সেই অপেক্ষায় আছেন এই তরুণী।




























