ক্রিসমাসের দুই দিন পর, সকাল ৭টার ঠিক আগে পল প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। ভিয়েতনামে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া ৫০ বছর বয়সী এই নাইজেরিয়ান নাগরিক কম্বোডিয়ায় ভালো বেতনের প্রশাসনিক চাকরির আশায় গিয়ে পড়েছিলেন অপরাধী চক্রের কবলে। তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল অনলাইন স্ক্যাম চালানো একটি অপরাধী চক্রের কাছে। মারধর ও নির্যাতনের মাধ্যমে বাধ্য করা এই কর্মীরা, যাদের সংখ্যা কয়েক লাখ বলে ধারণা করা হয়, স্ক্যাম ও অবৈধ জুয়া শিল্পে শ্রম দিতে বাধ্য হন। পল জানান, তাকে বিভিন্ন সাইটে স্থানান্তর করা হতো যাতে পুলিশের অভিযান থেকে অপরাধী চক্রগুলো রক্ষা পায়।
ডিসেম্বরে তিনি ছিলেন চ্যাম নামক একটি জঙ্গল এলাকায়, যেখানে খেমার রুজ নেতা পল পটের সমাধি অবস্থিত। এলাকাটি একটি ক্যাসিনো কমপ্লেক্সের ভেতরে ছিল। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে জুন মাস থেকে সীমান্ত বন্ধ ছিল। ডিসেম্বর মাসে অস্ত্রবিরতির আলোচনা চললেও, তা কার্যকর হওয়ার আগেই থাইল্যান্ড আক্রমণ শুরু করে। পল জানান, ড্রোন ও বোমার আঘাতে হোটেল-ক্যাসিনো এলাকাটি বিধ্বস্ত হয়। অনেক মানুষ মারা যান এবং সড়কে থাকা গাড়িগুলো বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। থাই সামরিক বাহিনী এই অভিযানকে ‘স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে।
প্রাথমিকভাবে কম্বোডিয়া একে থাইল্যান্ডের বাড়াবাড়ি বলে অভিযোগ করলেও, পরবর্তীতে তারা দেশজুড়ে স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। কম্বোডিয়ার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাদের এই অভিযানে প্রায় ৩ লাখ স্ক্যামার দেশ ছেড়েছে এবং ২৫০টিরও বেশি কম্পাউন্ড বন্ধ হয়েছে। সিনিয়র মন্ত্রী ছাই সিনারিথ জানিয়েছেন, এসব স্থাপনা এখন রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। অথচ এই স্থাপনাগুলোর অনেকগুলোর সাথেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের যোগসূত্র রয়েছে। প্রিন্স হোল্ডিং গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
কম্বোডিয়া সরকার এই স্ক্যাম দমনের দোহাই দিয়ে তাদের কারাগারের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। অনেক স্ক্যাম কম্পাউন্ডকে এখন কারাগার বা অভিবাসন আটক কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। এদিকে দেশটির কারাগারের সংখ্যা গত দশকে তিনগুণ বেড়েছে, যা ধারণক্ষমতার ৪ গুণ ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, পরিবেশবাদী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য কঠোর আইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি সীমান্তে ছবি তোলার অপরাধে দুই সাংবাদিককে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে সরকার অপরাধীদের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদেরও সামরিক প্রকৌশল ও নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছে। এদিকে থাইল্যান্ডের সাথে উত্তেজনা রয়েই গেছে, যেখানে থাই সেনারা এখনো সীমান্তের অনেক এলাকা দখল করে রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের ফলে সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে কম্বোডিয়ার আগ্রহ বেড়েছে। চীন, ভারত ও রাশিয়ার সাথে সামরিক সহযোগিতা ও মহড়া বৃদ্ধি করেছে দেশটি। ২০২৬ সালের জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে রেকর্ড ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং নতুন বাধ্যতামূলক সামরিক আইন কার্যকর করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কম্বোডিয়া তার অভ্যন্তরীণ স্ক্যামবিরোধী অভিযানকে ব্যবহার করে সামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনকে আরও শক্তিশালী করছে।




























