মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়ার সময়কাল সংক্ষিপ্ত করেছে এবং ফিল্ড ট্রেনিং অনুশীলনের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই বার্ষিক যুদ্ধ মহড়াগুলোতে একটি “সাবস্টেনশিয়াল রিডাকশন” বা উল্লেখযোগ্য হ্রাস করার নির্দেশ দেওয়ার পর মিত্র দেশ দুটি এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
গত ১৭ আগস্ট শুরু হওয়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়াটি মূলত ১১ দিন স্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও, এখন তা মাত্র পাঁচ দিনে শেষ হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, মহড়াটি ২১ আগস্ট শেষ হবে। জেসিএস আরও জানায়, ওয়াশিংটনের পরামর্শেই মহড়ার সময়কাল কমানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর পাশাপাশি কিছু যৌথ ফিল্ড ম্যানুভার প্রশিক্ষণও সীমিত করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন যে, মিত্র দেশগুলো মহড়ার দ্বিতীয় ধাপটি বাতিল করার পথে রয়েছে। মহড়ার এই পর্যায়ে মূলত প্রাথমিক রক্ষণাত্মক ধাপের পর পাল্টা আক্রমণের অনুশীলন হওয়ার কথা ছিল। পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ মহড়া এবং এর সাথে সম্পর্কিত সরাসরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে, যার মধ্যে কিছু অংশ বাতিল করা হয়েছে অথবা সিমুলেশনে রূপান্তর করা হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তার দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে মার্কিন প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্যগুলো ব্যাহত হবে না এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বজায় থাকবে।
এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে ট্রাম্পের গত রবিবারের নির্দেশ, যেখানে তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সাথে তার “ভেরি গুড রিলেশনশিপ” বা অত্যন্ত ভালো সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ার ইরানবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টিকেও যুক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন বুধবার এক সংসদীয় শুনানিতে জানান, ট্রাম্পের এই আকস্মিক নির্দেশ সম্পর্কে দক্ষিণ কোরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তাই আগে থেকে অবগত ছিলেন না। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এই বার্তার পেছনে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ এবং ইরান যুদ্ধের অচলাবস্থা ভাঙার একটি কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এই যৌথ মহড়াকে তাদের ওপর আক্রমণের মহড়া হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে। বুধবারও পিয়ংইয়ং এই মহড়ার সমালোচনা করে জানায়, ওয়াশিংটন ও সিউলের সামরিক হুমকির বিপরীতে তারা নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে, সিউলের প্রেসিডেন্সিয়াল অফিস জানিয়েছে যে, এই মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণ করা বা কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বাড়ানো নয়।
ট্রাম্প সোমবার দাবি করেছেন যে, কিম জং উন তার সাথে যোগাযোগ করেছেন, তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতার সাথে তার সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি পরিস্থিতিকে “অনেক বেশি নিরাপদ” করে তুলছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এই শরতে কিমের সাথে সরাসরি বৈঠকের জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন এবং নভেম্বরে এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন সম্মেলনে চীনের শেনঝেনে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন।
কোরীয় উপদ্বীপে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২৮,৫০০ সেনা মোতায়েন রেখেছে। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরিয়ান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছিল একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে, কোনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে নয়। তবে ট্রাম্পের বারবার ঐতিহ্যবাহী জোটগুলোর সমালোচনা পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি মঙ্গলবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান যখন সবচেয়ে জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” একই সাথে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লস উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উত্তর কোরিয়া বর্তমান বিশ্বের অনেক চ্যালেঞ্জের মূল হোতা।
সূত্র: আল জাজিরা































