বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ ইতুরূপ (জাপানে যা এতোরোফু নামে পরিচিত) সফরে গেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এই সফরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মিত্র ও প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে চরম রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই দ্বীপপুঞ্জটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জাপান এটিকে নিজেদের ‘উত্তর অঞ্চল’ বা নর্দার্ন টেরিটরিজ বলে দাবি করে আসছে। এই সীমানা বিরোধের কারণেই আজ পর্যন্ত দেশ দুটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানতে কোনো শান্তি চুক্তিতে সই করতে পারেনি।
অতীতে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তাঁর বাবা তথা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিনতারো আবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর জবাবে রাশিয়া জাপানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির আলোচনা স্থগিত করে এবং দ্বীপে থাকা জাপানি নাগরিকদের পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করার জন্য দেওয়া ভিসা-মুক্ত যাতায়াত সুবিধা বাতিল করে দেয়।
এর আগে ২০১০ সালে তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এই দ্বীপপুঞ্জ সফর করলেও পুতিনের জন্য এটিই প্রথম সফর। সফরকালে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ‘হিরো অব রাশিয়া’ খেতাবপ্রাপ্ত সেনা সদস্য ই. ডি. নরপোলভের নামে উৎসর্গীকৃত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। পুতিনের এই সফরের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে। এক টেলিভিশন বিবৃতিতে তিনি বলেন, রুশ প্রেসিডেন্টের এই সফর জাপানের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে এবং এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমরা আশা করি রুশ পক্ষ এই বিষয়টির গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করবে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি আরও যোগ করেন, এই সফরের ফলে জাপানের সাধারণ মানুষের মধ্যে রাশিয়ার প্রতি ক্ষোভ আরও তীব্র হবে, যা মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা কঠিন করে তুলবে।
সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিলেও প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি নিজেই সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর পর্যায়ে চলে যাওয়ায় এর শান্তিপূর্ণ ও নিরিবিলি সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে তাকাইচির এই বিবৃতির পর মস্কোয় নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত মুতো আকিরাকে তলব করেন রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন। তিনি জাপানের এই অবস্থানের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জের ওপর রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব এবং এখতিয়ার অলঙ্ঘনীয়। এই স্পষ্ট বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার জাপানি প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই সফরের পেছনে সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক কৌশল রয়েছে। প্রথমত, জাপানের এই অনুমিত প্রতিবাদের সুযোগ নিয়ে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া একজোট হয়ে জাপানের ‘আগ্রাসী’ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন চরম সংকটের মুখে। জাপানের আমদানিকৃত পেট্রোলিয়ামের ৯০ শতাংশ এবং এলএনজির ৬ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই দুর্বলতার কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ টোকিওর নেই। জাপান বর্তমানে তার মোট এলএনজি চাহিদার ৯ শতাংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করে এবং সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে এলএনজি আমদানির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশেষ ছাড় পেয়েছে। এমনকি গত মে মাস থেকে জাপান পুনরায় রুশ তেল আমদানি শুরু করেছে।
তৃতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮১তম বার্ষিকীর ঠিক দুই দিন আগে পুতিন এই সফরের সিদ্ধান্ত নেন, যা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক বিরোধের সংবেদনশীল সময়ে রুশ গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। পুতিনের সফরের দিনই জাপানে নিযুক্ত চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতরা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁদের জনগণের অবদানই যুদ্ধোত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছে। তাঁরা এ সময় এশিয়ায় পুনরায় সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেন। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ায় প্রথম নিম্নকক্ষের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা পুতিনের এই সফরের অন্যতম রাজনৈতিক অনুষঙ্গ।
পুতিনের এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জের কাছে রাশিয়ার প্যাসিফিক ফ্লিট লাইভ-ফায়ার বা তাজা গুলি বর্ষণের নৌমহড়া চালাচ্ছে। আগামী ২৯ আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারিত এই সামরিক মহড়া ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করার পরই পুতিন ইতুরূপ দ্বীপে যান। জাপানের পক্ষ থেকে এই সামরিক মহড়ার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের পরামর্শ, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় জাপানকে রাশিয়ার এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নজর দিতে হবে এবং রুশ হুমকি মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে।




























