মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি পেট্রোল স্টেশনে নিজের গাড়িতে বসে দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় আছেন স্ভিয়াতোস্লাভ। তার সামনে থাকা সাইনবোর্ডটি সবেমাত্র পরিবর্তন করে জানানো হয়েছে যে, সেখানে কোনো জ্বালানি নেই। স্ভিয়াতোস্লাভ আশাবাদী হয়ে বলেন, তারা জানে না কখন জ্বালানি আসবে, তবে আজ বা আগামীকাল আসতে পারে। তার গাড়ির ট্যাঙ্কে অন্য কোথাও যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত তেল অবশিষ্ট নেই। এই সপ্তাহে মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানে পেট্রোলের জন্য দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা গেছে।
রুশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে 'অনির্ধারিত মেরামত' কাজের কারণে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এই মেরামত কাজের নেপথ্যে রয়েছে রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলোতে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলা। চলতি গ্রীষ্মের শুরু থেকেই দূরপাল্লার এই হামলাগুলো বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে মস্কোতে পেট্রোলের জন্য অপেক্ষমান গাড়ির লাইন আগের চেয়ে দীর্ঘ হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ শোধনাগার সক্ষমতা ও লজিস্টিক সমস্যা সমাধানে হিমশিম খাচ্ছে। নেজাভিসিমায়া গাজেতা পত্রিকা একে জ্বালানি সংকটের 'দ্বিতীয় ঢেউ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
মস্কোর রাস্তায় এখন দুটি দৃশ্য চোখে পড়ার মতো—একটি হলো রাশিয়ান ফ্ল্যাগ ডে উপলক্ষে বিশাল সব বিলবোর্ড, অন্যটি পেট্রোল পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি। একটি স্টেশনের বাইরেই প্রায় ৮০টি গাড়িকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। জ্বালানি পাওয়ার এই লড়াই এখন একটি নিয়মিত সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। এলিজাভেতা নামের একজন জানান, তিনি রাত ১১টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু মধ্যরাতে স্টেশনে পৌঁছানোর পর রাত ২টা পর্যন্ত তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। লুবভ নামের আরেকজন জানান, প্রদেশ থেকে মস্কো আসার পথে তিনি সবগুলো পেট্রোল পাম্পই খালি পেয়েছেন। লুবভ মনে করেন, দেশের এই কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে সবাই যুদ্ধের বিষয়টি জড়িয়ে ফেলছেন।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের আগে রাশিয়ার অভ্যন্তরে কোনো তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেনি। এই হামলাগুলো ক্রেমলিনকে তাদের 'বিশেষ সামরিক অভিযান' থেকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারেনি। সংকট নিরসনে রাশিয়া এখন বিদেশ থেকে পেট্রোল আমদানি শুরু করেছে, যা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়ার জন্য অস্বাভাবিক। সরকারি পত্রিকা রসিস্কায়া গাজেতা সতর্ক করেছে যে, নিম্নমানের পেট্রোল ব্যবহার আধুনিক গাড়ির ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শুধু তেল শোধনাগার নয়, রাশিয়ার অ্যামাজনখ্যাত 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর বিতরণ কেন্দ্রে ইউক্রেনের হামলা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেছেন যে, শিল্প স্থাপনায় এই হামলাগুলো ক্ষতি করছে, তবে তিনি দাবি করেছেন এর কোনো 'ক্রিটিক্যাল' বা গুরুতর পরিণতি নেই। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নোভায়া গাজেতার কলামিস্ট আন্দ্রে কোলেসনিকভ মনে করেন, পুতিনের বাস্তবতার বর্ণনার সঙ্গে জনগণের অনুভূতির বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী রাশিয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে এবং ক্রেমলিনের 'শান্ত থাকুন ও কাজ চালিয়ে যান' বার্তাটি খুব একটা কাজে আসছে না।
পেট্রোল পাম্পের কাছেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে রাশিয়ান ফ্ল্যাগ ডে উপলক্ষে কনসার্ট ও স্টল বসানো হয়েছে। সেখানে জ্বালানির অভাব থাকলেও দেশপ্রেমের কোনো কমতি নেই। শিশুদের হাতে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র, এমনকি হ্যান্ড-হেল্ড রকেট লঞ্চার তুলে দিয়ে ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা রুশ সমাজে সামরিকায়নের ইঙ্গিত দেয়। পেনশনভোগী তাতিয়ানা জানান, এই কঠিন সময় তাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করছে। তবে ড্রোন হামলার ভয়ে রাতে ঘুমানোর সময় মানুষের মনে যুদ্ধের আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই বলছেন, পেট্রোল সংকট ও উচ্চমূল্যের পাশাপাশি এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো মানসিকভাবে শক্ত থাকা।


























