বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত মানুষ এথেল ক্যাটারহ্যাম ১১৭ বছর বয়সে পদার্পণ করেছেন। যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সারে কাউন্টির একটি কেয়ার হোমে শুক্রবার (২১ আগস্ট) অত্যন্ত সাদামাদাভাবে তাঁর এই বিশেষ জন্মদিনটি উদযাপন করা হয়। সারে কাউন্টিটি লন্ডন থেকে প্রায় ৩২ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
এথেল হলেন যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম এবং বিশ্বের ১৩তম ব্যক্তি যিনি ১১৭তম জন্মদিন উদযাপন করলেন। অতি-শতবর্ষী (সুপারসেন্টেনারিয়ান) গবেষণা সংস্থা 'লঞ্জিভিকুয়েস্ট'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বেন মেয়ার্স এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এথেলকে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ইউরোপীয় সুপারসেন্টেনারিয়ান অর্গানাইজেশন (ইএসও) এবং লঞ্জিভিকুয়েস্ট যৌথভাবে তাঁর বয়স যাচাই করেছিল।
জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় এ বছর বেশ কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে এথেলের। লঞ্জিভিকুয়েস্টের কাছে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "জন্মদিনের এত সুন্দর শুভেচ্ছার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। ১১৭ বছর বয়সে এসেও এ বছর আমি অনেক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি—লামা স্পর্শ করা থেকে শুরু করে রাজার হাত ধরা!"
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজা চার্লস স্বয়ং এথেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, কারণ এথেল রাজার সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। রাজার প্রপ্রিতামহ (গ্রেট-গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার) সপ্তম এডওয়ার্ডের প্রজাদের মধ্যে এথেলই একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। রাজার সাথে করমর্দন করার সময় তিনি বেশ পরিপাটি পোশাক পরেছিলেন—যার মধ্যে ছিল সোনালি রঙের সিকুইন করা জুতো, একটি সেজ রঙের পোশাক এবং হালকা গোলাপি শাল।
রাজার সাথে সাক্ষাতের সময় এথেল ১৯৬০-এর দশকে তাঁর প্রয়াত স্বামী নরম্যানের সাথে বাকিংহাম প্যালেসের একটি গার্ডেন পার্টিতে অংশ নেওয়ার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি রাজাকে বলেন, "ক্যারনারভন দুর্গে আপনার মা যখন আপনাকে মুকুট পরিয়েছিলেন, সেই দৃশ্য আমার মনে আছে।" এথেল রসিকতা করে আরও বলেন, তরুণ বয়সে মেয়েরা রাজকুমার চার্লসের প্রেমে পাগল ছিল এবং তাকে বিয়ে করতে চাইত।
১৯০৯ সালের ২১ আগস্ট হ্যাম্পশায়ারের শিপটন বেলিনজারে জন্ম নেওয়া এথেলের বেড়ে ওঠা উইল্টশায়ারে। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। তাঁর শৈশব ছিল অত্যন্ত সাধারণ; বাড়িতে বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ ছিল না, নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি এবং একটি গৃহপালিত শূকরের ওপর নির্ভর করে চলত তাদের পরিবার। দীর্ঘায়ু হওয়ার গোপন রহস্য হিসেবে ২০২০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলাই তাঁর জীবনের মূল চাবিকাঠি।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে এথেল এক ব্রিটিশ পরিবারের ন্যানি (ধাত্রী) হিসেবে কাজ নিয়ে জাহাজে করে তিন সপ্তাহের দীর্ঘ যাত্রা শেষে ভারতে যান এবং সেখানে তিন বছর কাটান। ১৯৩১ সালে দেশে ফিরে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মেজর নরম্যান ক্যাটারহ্যামের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। একসময় তারা হংকংয়েও বসবাস করেছেন, যেখানে এথেল একটি নার্সারি খোলেন এবং ইংরেজি শেখাতেন। ১৯৬০ সালে তিনি স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন।
বর্তমানে দুই কন্যা ও তিন নাতনির এই জননী অবসর সময় কাটাতে ভালোবাসেন রোদে বসে, পাখির ডাক শুনে এবং বাগানের ফুলের সুবাস নিয়ে। মাঝেমধ্যে তিনি কুইজ খেলেন এবং প্রিয় গান শোনেন। তাঁর ১১৭তম জন্মদিনে ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার মতো কণ্ঠধারী এক শিল্পী গান গেয়ে শোনান। এথেলের প্রিয় গান "থ্রি কয়েনস ইন আ ফাউন্টেন" পরিবেশন করা হয় অনুষ্ঠানে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ ব্রাজিলের জোয়াও মারিনহো নেতো (১১৩), ইংরেজ অতি-শতবর্ষী হিল্ডা লাক (১১২) এবং ওয়েলশ নাগরিক ওয়েন ফাইলার (১০৬)। নেতোর পরিবার পর্তুগিজ ভাষায় "পারাবেন্স এথেল" (অভিনন্দন এথেল) লেখা একটি প্ল্যাকার্ডসহ তাঁর ছবি এথেলকে পাঠিয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্ছ্বসিত এথেল বলেন, "পরিবার ও বন্ধুদের সাথে চমৎকার একটি দিন কাটালাম। আগামী বছর কী নিয়ে আসে, তা দেখার অপেক্ষায় আছি।"



























