২০২৬ সালের ১১ জুলাই অনুষ্ঠিত জোহর রাজ্য নির্বাচনে বারিসান নাসিওনাল (বিএন) মোট ৫৬টি আসনের মধ্যে ৪৮টিতে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন জোট পাকাতান হারাপান (পিএইচ) পেয়েছে মাত্র আটটি আসন। এই ফলাফলকে পর্যবেক্ষকদের একাংশ 'ব্লু ওয়েভ' বা নীল ঢেউ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য জোহরের এই ফলাফল দেশটির ফেডারেল রাজনীতির ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে কি না, তা নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
নির্বাচনের এই ফলাফলের গভীরতর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়। গত নির্বাচনের তুলনায় ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন, জাতিগত গঠন, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জোহরের রাজনীতিকে বুঝতে হবে। মূলত, বিএন আগে থেকেই ৪০টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ছিল, তাই এই নির্বাচনে তারা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা মাত্র আটটি আসন বাড়িয়েছে। জোহর ইউনাইটেড মালাই ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) জন্মস্থান এবং ঐতিহাসিকভাবে বিএনের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর বিএন সেখানে তাদের হারানো ভিত্তি ফিরে পেয়েছে মাত্র।
নির্বাচনের আসল চিত্রটি ফুটে উঠেছে জাতিগতভাবে মিশ্র নির্বাচনী এলাকাগুলোতে। যেসব এলাকায় মালয় ভোটারদের হার ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশের মধ্যে, সেখানে পিএইচ পরাজিত হয়েছে। জেমেনতাহ (এন০২) এবং বুকিত বাতু (এন৫১) এর মতো আসনে বিএনের প্রার্থীরা অত্যন্ত অল্প ব্যবধানে পিএইচের প্রার্থীদের পরাজিত করেছেন। জেমেনতাহতে বিএনের সি আন গিয়াপ ১২,৫২২ ভোট (৪৬.৩ শতাংশ) পেয়ে পিএইচের এনজি কোর সিমকে ৯১৩ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন। একইভাবে বুকিত বাতুতে বিএনের কুমারান রামাকৃষ্ণান ১৬,৮৯৯ ভোট (৪৭.৭ শতাংশ) পেয়ে পিএইচের আর্থার চিওং সেন সার্নকে মাত্র ১৭৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। তবে যেখানে মালয় ভোটারের হার ৪৫ শতাংশের কম, সেখানে পিএইচ তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। শহুরে ও উচ্চবিত্ত এলাকায়ও যেখানে জাতিগত মিশ্রণ রয়েছে, সেখানে বিএন জয়ী হয়েছে।
ভোটার উপস্থিতির হারেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২২ সালের ৫৪.৯২ শতাংশের তুলনায় এবার উপস্থিতি বেড়ে ৬৯.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্রামীণ মালয়-প্রধান এলাকায় ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৫.৭ থেকে ৬৮ শতাংশ, যা বিএনের অনুকূলে কাজ করেছে। অন্যদিকে, শহুরে এলাকায় অ-মালয় ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কিছুটা কম, গড়ে ৬০ শতাংশ। জোহর জয়ার (এন৪২) মতো শহুরে আসনেও ভোটারদের মধ্যে পিএইচ ও বিএনের সমর্থনের বিভাজন লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে মালয় ভোটারদের উচ্চ অংশগ্রহণ বিএনের জয়ে ভূমিকা রেখেছে।
নির্বাচনে প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি (পিএএস) এবং বারসাতুর অভ্যন্তরীণ কোন্দল পিএন জোটকে দুর্বল করে দিয়েছে। পিএএস গোপনে বিএনের প্রতি সমর্থন দেওয়ায় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুহিউদ্দিন ইয়াসিনের ঘাঁটি বুকিত কেপংয়ে (এন০৭) বারসাতুর প্রার্থী সাহরুদ্দিন জামাল বিএনের আহমেদ শারিয়ে ইউসুফের কাছে ১৬,৩৮৬ ভোট (৬১.৪ শতাংশ) পেয়ে পরাজিত হয়েছেন, যেখানে সাহরুদ্দিন পেয়েছেন মাত্র ৫,৬২৫ ভোট (২১.১ শতাংশ)। এটি বারসাতুর ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
এই নির্বাচনে প্রার্থী বা 'পোস্টার বয়' হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী অনন হাফিজ গাজিকে সামনে রেখে বিএন 'অন তাক অন' স্লোগান দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সফল হয়েছে। বিপরীতে, পিএইচ প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে সেভাবে প্রচারণায় ব্যবহার করতে পারেনি। তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব নয়, শক্তিশালী দলীয় ব্র্যান্ডের সাথে যুক্ত হলেই একজন প্রার্থী সফল হতে পারেন। নতুন দল 'বারসামা'র ব্যর্থতা এবং মুদা বা বারসাতুর ভরাডুবি প্রমাণ করে যে, ছোট দলগুলোর জন্য মালয়েশিয়ার বর্তমান দ্বি-দলীয় কাঠামোতে টিকে থাকা কঠিন। জোহরের এই নির্বাচন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মালয়েশিয়ার রাজনীতি আবারও বিএনের মতো প্রধান জোটগুলোর দিকেই ধাবিত হচ্ছে।
































