রাজধানীর তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গতকাল মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বড় ধরনের সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই এই দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুপুর ১২টার দিকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, যা পরে ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তিন জায়গায় সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন এবং উত্তেজনা সন্ধ্যা পর্যন্ত বজায় ছিল। এর আগে সোমবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল, যার ফলে পরপর দুই দিনে দেশের চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সংঘাতের ঘটনা ঘটল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ছাত্রলীগের দখলে ছিল। তখন ছাত্রদল ও শিবির প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে গেলে হামলার শিকার হতো। এখন ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বেশির ভাগ পদে শিবির-সমর্থিত প্যানেল জয়ী হয়, যেখানে ছাত্রদল ভালো করতে পারেনি। ছাত্রদলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে শিবির পরিচয় গোপন রেখে সংগঠন গুছিয়েছে, কিন্তু ছাত্রদলকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমকামিতার অভিযোগসহ কয়েকটি ঘটনায় শিবিরকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে ছাত্রদল।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল সকালে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা চলছিল। সেখানে জকসু প্রতিনিধি, জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মেডিক্যাল সেন্টারের সেবার মান বাড়ানোর দাবিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল ও প্রক্টরিয়াল বডি তাঁদের বাধা দেয়। ছাত্রদলের দাবি, তারা বিভিন্ন দাবি নিয়ে না যেতে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু অন্যরা তা শোনেনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান জানান, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদকে অপমানিত করার জন্য শিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো প্রস্তুতি নিয়েছিল। দুপুর ১২টার দিকে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের প্রচার সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানের ওপর ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা হামলা চালায়। একপর্যায়ে শিবিরের নেতা-কর্মীরা মেডিক্যাল সেন্টারে আশ্রয় নিলে সেখানেও হামলা চালানো হয়। এ সময় ছাত্রশক্তির বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকেও মারধর করা হয়। এদিকে বিচার চেয়ে উপাচার্য ভবনের সামনে মানববন্ধন করা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারের সামনে ছাত্রদল মারধর করে।
আহত শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীরা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও বিকেল ৩টা ও ৫টার দিকে দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রদল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল এবং বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মকবুল হোসেন জানান, বেলা ১টার পর থেকে অন্তত ৫০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন। গুরুতর আহত চার-পাঁচজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ, সমাজসেবা সম্পাদক মুস্তাফিজ রহমান, কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুক, ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ রয়েছেন। ছাত্রদলের জাফর আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, রবিউল আউয়াল, কল্যাণ কর ও ইয়াছিন সাইফও আহত হয়েছেন। সন্ধ্যায় পুলিশের পাহারায় আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে সরিয়ে নেওয়া হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন ঘটনার তদন্তে সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তফা হাসানকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন। এছাড়া বুধবার ও বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তা দেবে। সংঘর্ষের নেপথ্যে কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনা ৭ একর জমিতে ১ হাজার ৬০০ আসনের অস্থায়ী হলের পরিবর্তে ৬০০ আসনের স্থায়ী ১০ তলা ছাত্র হল নির্মাণের দরপত্র নিয়ে বিরোধের কথা শোনা যাচ্ছে। জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, ছাত্রদল টেন্ডারবাজি করতে না পারার ক্ষোভ থেকে এই হামলা করেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর দুপুরে ঢাকা কলেজে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে উত্তেজনা ও মারামারি হয়। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে নিউমার্কেট এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও দুই পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। শিবিরের আলিয়া মাদ্রাসা শাখার সভাপতি আবদুল আলিম অভিযোগ করেন, ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা হলে ঢুকে মারধর করেছেন এবং কয়েকটি কক্ষে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রদলের আলিয়া মাদ্রাসা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক পদপ্রার্থী সাদ চৌধুরী দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবির হলের কয়েকটি কক্ষ দখল করে রেখেছে। মঙ্গলবার একটি কক্ষ তালাবদ্ধ করাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ছাত্রদল ও যুবদলের অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন। সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করে শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা কক্ষ ভাঙচুর করেন। এ সময় অধ্যক্ষ ওবায়দুল হককে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাতে ছাত্রশিবির হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছে। ছাত্রদল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলেও সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে থাকবে। ছাত্রশিবিরের সভাপতি অভিযোগ করেছেন, জনদুর্ভোগ আড়াল করতে ছাত্রদল ও যুবদল দিয়ে হামলা করানো হচ্ছে।





























