ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে কভিতনেভা রেলওয়ে স্টেশনে রাশিয়ার ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। গতকাল গভীর রাতে চালানো এই হামলায় রাশিয়া ১১৫টি ড্রোন ও ২৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ড্রোন ভূপাতিত করতে পারলেও, ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র সংকটের কারণে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করতে পারেনি।
কভিতনেভা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু রেললাইন নাকি পাশের গুদামঘর ছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। হামলার কয়েক ঘণ্টা পরও গুদামঘরটি জ্বলছিল এবং পাশের আরেকটি গুদামঘরে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। মধ্যরাতের পর খুব অল্প সময়ের নোটিশে এই হামলা চালানো হয়, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিয়েভে হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি। হামলার হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা আনাস্তাসিয়া ডুডলি জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভীতিজনক রাত। হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে তার তিনতলা বাড়ির ওপর একটি ড্রোন আছড়ে পড়ে, যার ফলে ছাদ এবং তৃতীয় তলা পুরোপুরি ধসে যায়।
সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন চরম দুর্বলতার মুখে পড়েছে, যার ফলে এক একটি হামলায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এতদিন রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করত। তবে ইরান-সংঘাতের কারণে নিজস্ব মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র দিতে দ্বিধাবোধ করছে। জুলাইয়ের শুরুতে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট তৈরির লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই সরবরাহ বিলম্বের সঙ্গে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সরাসরি যুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইন্টারসেপ্টরের অভাব রাশিয়াকে আরও বড় বড় হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে। ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে কথা বলার পর জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের মানুষের জীবন পুরোপুরি ইউরোপ ও আমেরিকার অংশীদারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে অন্তত দুটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয়, যার পাল্লা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার। অথচ রাশিয়া প্রতিটি বড় হামলায় গড়ে ২০ থেকে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। ইউক্রেনের সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইভান স্টুপাক পরিস্থিতিটিকে গ্যারেজে রাখা জ্বালানিহীন সুপারকারের সাথে তুলনা করে বলেন, মনে করুন আপনার গ্যারেজে একটি ল্যাম্বরগিনি গাড়ি আছে কিন্তু কোনো জ্বালানি নেই। গাড়িটি বিশ্বের অন্যতম সেরা হলেও আপনি তা চালাতে পারবেন না। প্যাট্রিয়টের পরিস্থিতিও ঠিক তেমনই—সিস্টেম আছে কিন্তু ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নেই। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলে এই মূল্যবান সিস্টেমগুলো নিজেই রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এবং ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
কভিতনেভা স্টেশনে যখন বিদ্যুৎ সংযোগ মেরামতের কাজ চলছে যাতে দ্রুত ট্রেন চলাচল শুরু করা যায়, তখন ইউক্রেনীয়রা ভালো করেই জানে যে যেকোনো মুহূর্তে তাদের আকাশ আবার মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে। আর এই বিপদ থেকে বাঁচা এখন নির্ভর করছে ইউক্রেন সীমান্ত থেকে হাজার মাইল দূরে নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।































