ফ্রান্সে এই গ্রীষ্মে ছড়িয়ে পড়া বিধ্বংসী দাবানল দেশটির ইতিহাসের নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এত বিশাল এলাকা পুড়ে যাওয়া এবং এত বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এর ফলে ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো অগ্নিঝড় বা ফায়ারস্টর্ম থান্ডারক্লাউড তৈরি হয়েছে। এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া লিমোজেস শহরের আকাশকে ঢেকে ফেলেছিল, যেখানে বিষাক্ত ধূলিকণার মাত্রা গত বছর দিল্লির সর্বোচ্চ দূষণের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বোর্দোর বাইরের বনভূমিতে জুলাইয়ের শেষভাগে শুরু হওয়া এই দাবানল মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফ্রান্সের অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এই দুর্যোগের নেপথ্যে রয়েছে প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস। অষ্টাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের উপকূলীয় জলাভূমিগুলো এতটাই কর্দমাক্ত ছিল যে রাখালরা হাঁটাপায়ে বা স্টিল্ট ব্যবহার করে চলাফেরা করত। ১৮৫৭ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয়-এর এক ডিক্রির মাধ্যমে এই জলাভূমি শুকিয়ে সেখানে সামুদ্রিক পাইন গাছ রোপণের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে ইউরোপের বৃহত্তম মানবসৃষ্ট বনভূমিতে পরিণত হয়। বর্তমানে এই বন থেকে প্রাপ্ত কাঠ স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং এটি ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস।
অগ্নি নির্বাপক কর্মীদের জন্য এই বন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ল্যান্ডেস বনের ৯০ শতাংশই পাইন গাছ, যার রেজিন বা আঠা পেট্রোলের মতো জ্বলে। এছাড়া ঝরে পড়া পাইন সুঁচালো পাতা এবং পাইন কোণ বাতাসের সঙ্গে গ্রেনেডের মতো ছড়িয়ে পড়ে অগ্নিকাণ্ডকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। বনটিতে বৈচিত্র্যময় গাছপালা না থাকায় এবং কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির আধিক্য থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক বাধাগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ১৯৪৯ সালেও একই ধরনের এক অগ্নিকাণ্ডে ৫০ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গিয়েছিল এবং ৮২ জন স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দাবানল হিসেবে পরিচিত।
১৮৫৭ সালের পর থেকে মানবসৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের ফলে ইউরোপের তাপমাত্রা ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চরম শুষ্ক ও উত্তপ্ত আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। চলতি বছর পশ্চিম ইউরোপে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে গাছপালা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তী তীব্র তাপপ্রবাহ সেগুলোকে শুকিয়ে ফেলে প্রচুর জ্বালানি তৈরি করেছিল। ২২ জুলাই দুপুর নাগাদ বোর্দো থেকে ২০ মাইল পশ্চিমে সাউমোস গ্রামের কাছে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। স্থানীয় একটি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনডিস-এর চুক্তিবদ্ধ কর্মীরা সেখানে কাজ করছিলেন এবং একটি ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার কথা শোনা গেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
এই দাবানলে প্রায় ৩০০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা ইউরোপে শান্তির সময়ে নজিরবিহীন। যদিও কোনো সরাসরি প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে অগ্নিনির্বাপণ করতে গিয়ে অন্য এলাকায় চারজন কর্মী মারা গেছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়বে। ভবিষ্যতে ইউরোপে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ ৩৯ শতাংশ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন বিশেষজ্ঞরা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বনের বৈচিত্র্য রক্ষা এবং সুপরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন।































