দীর্ঘ ১১ বছরের নীরবতা ভেঙে নতুন অ্যালবাম নিয়ে ফিরছেন প্রখ্যাত মার্কিন গায়িকা, গীতিকার ও সংগীত প্রযোজক এরিকাহ বাদু। আন্ডারগ্রাউন্ড প্রযোজক ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’-এর (অ্যালান মামান) সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি তাঁর এই নতুন অ্যালবামের নাম ‘বিফোর দ্য ওয়ার্ল্ড ব্লোজ: দ্য আবি অ্যান্ড অ্যালান এক্সপেরিমেন্ট’। ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বাট ইউ কেইন্ট ইউজ মাই ফোন’ মিক্সটেপের পর এটিই তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রজেক্ট। সম্প্রতি লন্ডনের সোহো হোটেলের একটি ব্যক্তিগত কক্ষে বসে নিজের নতুন গান, ডুলা (প্রসবকালীন সহায়তাকারী) হিসেবে জীবন এবং প্রাক্তনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার রহস্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ৫৫ বছর বয়সী এই তারকা।
সাক্ষাৎকারের আগের রাতে তিনি কৌতুক অভিনেতা ডেভ চ্যাপেলের সঙ্গে ভোর পর্যন্ত পিয়ানো বাজিয়ে গান গেয়েছেন। সেই ঘরোয়া পার্টির আমেজ নিয়েই তিনি কথা বলেন তাঁর দীর্ঘ বিরতি নিয়ে। এত দীর্ঘ সময় পর নতুন গান নিয়ে আসা প্রসঙ্গে এরিকাহ বাদু জানান, জীবনকে কাছ থেকে দেখা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা তাঁর গান লেখার অন্যতম কাঁচামাল। তিনি বলেন, "তথ্য সংগ্রহ করা এবং জীবনকে অনুভব করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ হয়ে যায়, তখন আমি গানের মাধ্যমে তা প্রকাশ করি।"
নতুন এই অ্যালবামে বাদুর সঙ্গে কাজ করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের জনপ্রিয় প্রযোজক অ্যালান মামান, যিনি ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ নামে পরিচিত। ১৯৯৭ সালে সাইপ্রেস হিলের রোডিস্ট হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই তিনি বাদুর বড় ভক্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর বাদুর সহকারী কোল্ড ক্রিসের মাধ্যমে তাঁদের যোগাযোগ হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে স্টুডিওতে কাজ শুরু করেন। অ্যালান মামানের সুরকে শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে তুলনা করে বাদু বলেন, "তাঁর সুরের বুনন আমাকে শিহরিত করে।"
টেক্সাসের ডালাসে জন্ম নেওয়া এরিকাহ বাদুর শৈশব কেটেছে সংগীত ও শিল্পের আবহে। তাঁর মা ছিলেন একজন অভিনয়শিল্পী এবং নানি তাঁকে প্রথম পিয়ানো কিনে দিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘বাদুইজম’ তাঁকে বিশ্বজুড়ে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। সে সময় মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী কেদার মাসেনবার্গ তাঁকে ‘কুইন অব নিও সোল’ বা নিও সোল সংগীতের রানি হিসেবে আখ্যায়িত করলেও বাদু তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বন্দি রাখতে চাননি। ২০০০ সালে মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘মামাজ গান’। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বাদু বলেন, মাত্র তিন বছরের মধ্যে তাঁর জীবনে বিশাল পরিবর্তন এসেছিল। ১৯৯৭ সালে সংগীতশিল্পী আন্দ্রে ৩০০০-এর সঙ্গে তাঁর ছেলে সেভেনের জন্ম হয় এবং এর এক বছর পর তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। একই সঙ্গে নতুন বাড়ি, অর্থ এবং খ্যাতির চাপ সামলাতে হয়েছিল তাঁকে।
সংগীতের পাশাপাশি এরিকাহ বাদু একজন সার্টিফাইড ডুলা (গর্ভবতী নারীদের প্রসবকালীন সহায়তাকারী) এবং জীবনের শেষ মুহূর্তে থাকা মানুষের সেবাকারী (এন্ড-অফ-লাইফ ডুলা)। ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতি বছর অন্তত দুজন গর্ভবতী নারীকে সেবা দিয়েছেন, যার মধ্যে তিয়ানা টেইলর ও সামার ওয়াকারের মতো জনপ্রিয় তারকারাও রয়েছেন। ২০০৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ডুলার সনদ পান। বাদু জানান, ২০০১ সালে এক বন্ধুর সন্তান প্রসবের সময় টানা ৫২ ঘণ্টা জেগে থেকে সহায়তা করার পর তিনি বুঝতে পারেন যে এটিই তাঁর অন্যতম কাজ। তিনি প্রসূতি মায়েদের সূর্য, পৃথিবী, পুষ্টি, ব্যায়াম এবং আধ্যাত্মিকতা—এই পাঁচ উপাদানের মাধ্যমে সুস্থ রাখার চেষ্টা করেন। একইভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া মানুষের পাশে বসে তাঁদের শেষ সময়টা শান্তিময় করার কাজও করেন তিনি। স্টেজে গান গাওয়ার সঙ্গে এই সেবামূলক কাজের গভীর মিল রয়েছে বলে মনে করেন বাদু।
নতুন অ্যালবামের গানগুলোতে মূলত নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও জেন্ডার রাজনীতির বিষয়গুলো উঠে এসেছে। নিজের দুই মেয়ে পুমা (জন্ম ২০০৪) ও মার্স (জন্ম ২০০৯) এবং বিশ্বের সব তরুণীর উদ্দেশ্যে তিনি এই গানগুলোর মাধ্যমে বার্তা দিতে চেয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের ডেটিং সংস্কৃতি নিয়ে বাদু বলেন, "এখন আমরা নিজেদের ভুলত্রুটি, আত্মকেন্দ্রিকতা বা এডিএইচডির মতো বিষয়গুলোকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে নিজেদের আসল রূপটি হারিয়ে ফেলছি।" অ্যালবামের শেষ গান ‘ব্ল্যাক বক্স’ মূলত মোবাইল ফোনের প্রতি মানুষের আসক্তি নিয়ে তৈরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়মিত ব্যবহারকারী হওয়া সত্ত্বেও ফোনের প্রতি এই অতি-নির্ভরশীলতাকে ক্ষতিকর মনে করেন তিনি। এছাড়া এই অ্যালবামে স্টিভ লেসি এবং বাদুর প্রাক্তন সঙ্গী ও তাঁর মেয়ে মার্সের বাবা র্যাপার জে ইলেকট্রনিকার বিশেষ উপস্থিতি রয়েছে।
প্রাক্তন প্রেমিক ও স্বামীদের সঙ্গে সবসময় চমৎকার বন্ধুত্ব বজায় রাখার জন্য পরিচিত এরিকাহ বাদু। আন্দ্রে ৩০০০ কিংবা জে ইলেকট্রনিকা—সবার সঙ্গেই তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের রহস্য জানতে চাইলে হাসতে হাসতে বাদু বলেন, "তাঁরা প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর আগে আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। আমার মনে হয় এটাই আসল পার্থক্য গড়ে দেয়।" সাক্ষাৎকার শেষে বিদায় নেওয়ার আগে এই রহস্যময়ী গায়িকা স্বভাবসুলভ রসিকতায় সাংবাদিকের প্রশংসা করতেও ভুলেননি।































