ফরাসি সিনেমার পরিচিত মুখ লুই গ্যারেল তাঁর দীর্ঘ দুই দশকের অভিনয় ক্যারিয়ারে পর্দায় আকর্ষণীয় রূপ ধরে রাখার চেয়ে অভিনয়ের গভীরতাকেই এখন বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাঁর নতুন কমেডি সিনেমা ‘জাস্ট অ্যান ইলিউশন’ (Just an Illusion)-এ তাঁকে দেখা যাবে এক ভিন্ন ও কিছুটা অপ্রস্তুত চরিত্রে, যা তাঁর চিরচেনা ‘হার্টথ্রব’ ইমেজ থেকে একদম আলাদা।
৪৩ বছর বয়সী এই প্যারিস-বংশোদ্ভূত অভিনেতা কর্সিকার উপকূলে একটি নৌকায় শুয়ে ভিডিও কলের মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্যারিয়ার ও নতুন কাজ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। গ্যারেল জানান, ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করার পরও পর্দায় সুন্দর দেখানোর একটা সুপ্ত ইচ্ছা তাঁর মধ্যে কাজ করে। তবে তিনি মনে করেন, একজন ভালো অভিনেতা পর্দায় কেমন দেখাচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামান না। তাঁর ভাষায়, তরুণ বয়সে এক পরিচালক তাঁকে বলেছিলেন যে পর্দায় গরিলাদের মতো হতে হবে—যা দেখতে তীব্র ও আকর্ষণীয় হবে, কিন্তু নিজের রূপ নিয়ে কোনো সচেতনতা থাকবে না। যখন তিনি এই ধরণের চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন পর্দায় সুন্দর দেখানোর বাড়তি চিন্তা থাকে না এবং অভিনয়ও অনেক ভালো হয়।
লুই গ্যারেল দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি চলচ্চিত্রে একজন রোমান্টিক ও আকর্ষণীয় পুরুষ হিসেবে পরিচিত। ২০০৩ সালে বের্নার্দো বার্তোলুচ্চির ‘দ্য ড্রিমার্স’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন, যেখানে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ইভা গ্রিন ও মাইকেল পিট। এরপর ২০১০ সালে জাভিয়ের দোলানের ‘হার্টবিটস’, ফ্যাশন ড্রামা ‘কুতুর’ এবং ২০১৪ সালের বায়োপিক ‘সেন্ট লরেন্ট’-এ কার্ল ল্যাগারফেল্ডের সঙ্গী জাক দ্য বাশার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মন জয় করেন।
তবে এরিক তোলেদানো এবং অলিভিয়ের নাকাশ পরিচালিত নতুন সিনেমা ‘জাস্ট অ্যান ইলিউশন’-এ গ্যারেলকে সম্পূর্ণ ভিন্ন লুকে দেখা যাবে। ‘জাস্ট অ্যান ইলিউশন’ হলো গ্যারেল অভিনীত ৬২তম (62) চলচ্চিত্র এবং এটিই তাঁর প্রথম চরিত্র যা পিতৃত্বকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে। এখানে তিনি ‘ইভ’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যিনি রান্নাঘরের সরঞ্জাম তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা। চাকরি হারানোর বিষয়টি তিনি পরিবারের কাছে গোপন রাখেন। তবে সিনেমার মূল চরিত্র কিন্তু ইভ নন, বরং তাঁর ছোট ছেলে ১২ (12) বছর বয়সী ভিনসেন্ট (সিমোন বুবলিল), যে তার ক্লাসের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে। ৮০ (80) দশকের প্যারিসের শহরতলির পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমায় তাঁর চুল ও গোঁফের স্টাইল এবং ঢিলেঢালা ট্রেঞ্চকোট পরার ধরন ফরাসি কমেডিয়ান জাক তাতির ‘মসিয়েঁ উলো’ চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। সিনেমাটিতে ইভের স্ত্রী সাঁদ্রিনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কামিল কোতাঁ এবং কেয়ারটেকার মসিয়েঁ বের্জেরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন পিয়ের লতঁ।
‘জাস্ট অ্যান ইলিউশন’ সিনেমাটি ফ্রান্সে মুক্তির পর বেশ সাড়া ফেলেছে। এতে হাস্যরসের পাশাপাশি ফরাসি-জার্মান পুনর্মিলন, ১৮৭০ সালের ক্র্যাহমিউ ডিক্রি (যা আলজেরিয়ান ইহুদিদের ফরাসি নাগরিকত্ব দিয়েছিল), ফ্রন্ট ন্যাশনালের উত্থান এবং বর্ণবাদ বিরোধী কনসার্টের মতো কিছু বড় রাজনৈতিক বিষয় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ক্যারিয়ারে সফল স্ত্রীর পাশে একজন গৃহবন্দী স্বামীর মানসিক দ্বন্দ্বের গল্পও এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে লুই গ্যারেল গত বছর তাঁর আট বছরের সংসার জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্ত্রী লেটিটিয়া কাস্তার সঙ্গে আলাদা হয়ে যান। কাস্তার সঙ্গে তাঁর পাঁচ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। এছাড়া পূর্ববর্তী সম্পর্ক ভ্যালেরিয়া ব্রুনি তেদেস্কির (ফ্রান্সের সাবেক ফার্স্ট লেডি কার্লা ব্রুনির বোন) সঙ্গে তাঁর উমি ব্রুনি গ্যারেল নামের ১৮ বছর বয়সী এক দত্তক কন্যা রয়েছে। উমি অভিনয়ে প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও এই পেশায় না এসে নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা নিয়ে গ্যারেল বেশ গর্বিত।
চলচ্চিত্র পরিবারে বড় হওয়া গ্যারেল জানান, পাসোলিনি, গদার কিংবা ত্রুফোর মতো ১৯৬০ ও ১৯৭০ (1970) দশকের কিংবদন্তি পরিচালকদের কাজের পাশাপাশি তিনি ‘লিথাল ওয়েপন’-এর মতো মূলধারার সিনেমা থেকেও অনুপ্রাণিত হন। ৪৩ বছর বয়সী এই অভিনেতা এখন দর্শকদের হাসাতে ভালোবাসেন। চলতি বছরের শেষের দিকে ইতালীয় নির্মাতা নানি মোরেত্তির ‘ইট উইল হ্যাপেন টুনাইট’ সিনেমায় তাঁকে মূল চরিত্রে দেখা যাবে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের প্রেক্ষাগৃহে ‘জাস্ট অ্যান ইলিউশন’ মুক্তি পেতে যাচ্ছে।































