কানাডার সঙ্গে শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র রূপ নিয়েছে। এর জের ধরে গত ২৭ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিতর্কিত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। এই আদেশের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ‘লেক অন্টারিও’র নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ খোদ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, বিভ্রান্তি এবং হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যালিসন শুস্টার এক ইমেইল বিবৃতিতে জানান, এই হ্রদের বেশিরভাগ জলভাগ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থিত এবং নতুন নামটি হ্রদটির "আমেরিকায় অবস্থান ও এর ঐতিহ্যকে" প্রতিফলিত করবে। তবে এই পরিবর্তনের বিষয়ে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি। এমনকি ট্রাম্প পরবর্তীতে একটি মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের ধারণাও ব্যক্ত করেছেন বলে জানা গেছে।
এই সিদ্ধান্তের পর হ্রদের তীরবর্তী নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গেটস-এর বাসিন্দা শেরি টার্পিন জানান, শৈশব থেকেই প্রতি গ্রীষ্মে তিনি এখানে আসেন। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার কথা শুনে প্রথমে তার হাসি পেয়েছিল। তিনি বলেন, "আমি চাই এটি লেক অন্টারিও হিসেবেই থাকুক, কারণ এটি আমাদের ইতিহাসের অংশ।" লেক অন্টারিও নামটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা রাষ্ট্র দুটি প্রতিষ্ঠারও আগের।
গ্রিস এলাকার বাসিন্দা জন মেল্ডার এই খবর শুনে হেসে বলেন, "তিনি (ট্রাম্প) মেক্সিকো উপসাগর নিয়েও একই কাজ করেছিলেন, কিন্তু সেটি এখনও মেক্সিকো উপসাগরই রয়ে গেছে। আমি মনে করি মানুষ আমার মতোই এটিকে গুরুত্ব সহকারে নেবে না।" একই এলাকার বাসিন্দা ভিটো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের অপরাধসহ আরও অনেক সমস্যা রয়েছে যা সমাধান করা দরকার। এই জলাশয়টি সবসময় এখানেই থাকবে।"
ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, লেক অন্টারিও-র উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে রয়েছে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ এবং প্রধান শহর টরন্টো। অন্যদিকে হ্রদের দক্ষিণ ও পূর্ব তীর নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অধীনে, যার মধ্যে রচেস্টার শহর ও মনরো কাউন্টি অবস্থিত। নিউ ইয়র্কে একটি 'অন্টারিও বিচ পার্ক' এবং এমনকি 'অন্টারিও কাউন্টি' নামে একটি এলাকাও রয়েছে।
স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের অনেক রাজনীতিবিদ এই নাম পরিবর্তনকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। মনরো কাউন্টির নির্বাহী অ্যাডাম বেলো এক বিবৃতিতে বলেন, "লেক অন্টারিও লেক অন্টারিওই থাকবে। অন্টারিও বিচ পার্কও একই থাকবে। জেনিসি নদী ও ইরি খালও সুরক্ষিত আছে।" নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, "নিউ ইয়র্ক এটিকে এই নামে ডাকবে না।"
এমনকি ট্রাম্পের অনুগত কিছু রিপাবলিকানও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। উইসকনসিনের গভর্নর পদপ্রার্থী এবং ট্রাম্প সমর্থিত রিপাবলিকান প্রতিনিধি টম টিফানি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি গ্রেট লেকস বা বৃহৎ হ্রদগুলো তাদের আগের নামেই (লেক সুপিরিয়র, লেক মিশিগান, লেক অন্টারিও) থাকা উচিত।" অন্যদিকে ভার্মন্টের রিপাবলিকান গভর্নর ফিল স্কট এই পদক্ষেপকে "তুচ্ছ ও হতাশাজনক" বলে অভিহিত করেছেন।
ডেমোক্রেটিক রিপ্রেজেন্টেটিভ জোসেফ মোরেল বলেন, এটি মূলত কানাডার সাথে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা। রচেস্টারের মেয়র মালিক ইভান্স বলেন, "এটি সাধারণ মানুষকে এমন সব জটিল সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে রাখার আরেকটি চেষ্টা, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মালিকদের অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি করছে।"
তবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন কট্টরপন্থী কয়েকজন রক্ষণশীল নেতা। ইউটার সিনেটর মাইক লি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বারগাম সামাজিক মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। বারগাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন, "মেক দ্য গ্রেট লেকস গ্রেট এগেইন!"































