ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের দীর্ঘদিনের স্থগিত আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না, তা নির্ধারণে শনিবার গণভোটে ভোট দিচ্ছেন আইসল্যান্ডের নাগরিকরা। তবে এই ভোটটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রতিবেশী গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির এক গভীর উদ্বেগের মধ্যে।
আইসল্যান্ডের প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার যোগ্য ভোটারের সামনে প্রশ্নটি খুবই সহজ ও স্পষ্ট: আইসল্যান্ডের কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সদস্যপদ লাভের আলোচনা পুনরায় শুরু করা উচিত? তবে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ভোটাররা যদি এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন, তবে অন্তত আগামী এক প্রজন্মের জন্য ইইউতে যোগদানের বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যাবে।
বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে গ্রিনল্যান্ডকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য আইসল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড থেকে আইসল্যান্ডের দূরত্ব মাত্র ১৮০ মাইল (২৯০ কিলোমিটার)। ডেনমার্ক দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকার একটি ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ। যদিও ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি বলপ্রয়োগ করবেন না, তবে এই অঞ্চলের প্রতি তার আগ্রহ মোটেও কমেনি। আইসল্যান্ডের সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—গ্রিনল্যান্ড যদি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে পরবর্তী লক্ষ্য কি আইসল্যান্ড হবে?
২০২৪ সালে নির্বাচিত আইসল্যান্ডের বামপন্থী জোট সরকারও ঠিক এমনটাই মনে করছে। আর এই আশঙ্কার কারণেই তারা আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই গণভোটটি এগিয়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এই ভোটের অন্যতম প্রধান প্রভাব রয়েছে আইসল্যান্ডের জাতীয় পরিচয় এবং তাদের লাভজনক মৎস্য শিল্পের ওপর। বহু শতাব্দী ধরে ভাইকিংদের বংশধররা উত্তর মহাসাগরের শীতল জলসীমা থেকে কড ও হ্যাডক মাছ শিকার করে জীবনধারণ করছেন, যা তাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আইসল্যান্ডের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই লাভজনক ও সুনিয়ন্ত্রিত মৎস্য শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, গণভোটের প্রচারণায় মাছ ধরার অধিকারের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। ২৭টি দেশের জোট ইইউতে যোগ দিলে আইসল্যান্ডকে জোটের সাধারণ মৎস্য নীতি মেনে নিতে হবে, যার ফলে স্পেন বা নেদারল্যান্ডসের মতো অন্যান্য দেশের ট্রলারগুলোও আইসল্যান্ডের জলসীমায় মাছ ধরার সুযোগ পাবে। তবে আইসল্যান্ড সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই নীতি থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থার দাবি জানাবে।
can অনেকের মতে, এই গণভোটের মাধ্যমে আইসল্যান্ডের জাতীয় পরিচয় এবং সংস্কৃতিও পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ১৯৪৪ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করা আইসল্যান্ডের রয়েছে এক গৌরবময় ইতিহাস। বড় ও ধনী ইউরোপীয় দেশগুলোর চাপের মুখে মাথা নত না করার ঐতিহ্য রয়েছে তাদের। এমনকি ১৯৭০-এর দশকে মৎস্য সীমানা নিয়ে ব্রিটেনের সাথে ঐতিহাসিক “কড ওয়ার্স” বা কড যুদ্ধেও জয়ী হয়েছিল দেশটি। বর্তমানে আইসল্যান্ড ইইউর একক বাজার এবং শেঞ্জেন মুক্ত-ভ্রমণ অঞ্চলের অংশ হিসেবে সমস্ত সুবিধা ভোগ করছে।
ইইউ বিরোধীদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থাপনাই আইসল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এবং সার্বভৌমত্বে কোনো আপস না করেই তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমস্ত সুবিধা পাচ্ছে। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্যাটরিন ইয়াকোবসডত্তির বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “আমি মনে করি ইইউর বাইরে থেকে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রাখাই আইসল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে ভালো।”






























