বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানি ব্যয়ের শীর্ষে থাকলেও, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই জায়গা দখল করেছে ডিজেল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ডিজেল আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তুলার আমদানি মূল্য ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, তুলার তুলনায় ডিজেল আমদানিতে ২৪ কোটি ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরে ডিজেল তালিকার চতুর্থ অবস্থানে থাকলেও, এবার এর আমদানির পরিমাণ ৩৮ লাখ ৮০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ লাখ টন বেশি। বিপরীতে, তুলা আমদানিতে ব্যয় ১১ শতাংশ কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার জেরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি খরচে।
এনবিআর ও এর মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে মোট ৭৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পণ্যের প্রতিটির আমদানি মূল্য এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই ১১টি পণ্য আমদানিতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, এই হিসাব আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণপত্রভিত্তিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় নয়।
আমদানি ব্যয়ের তালিকায় জ্বালানি পণ্যের আধিপত্য স্পষ্ট। ডিজেল, এলএনজি (২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার), কয়লা (১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার), এলপিজি (১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার) এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার)—এই ৫টি জ্বালানি পণ্য আমদানিতে মোট ১০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ, দেশের মোট আমদানি মূল্যের প্রায় ১৪ শতাংশই ব্যয় হয়েছে এই পাঁচটি জ্বালানি পণ্যে।
জ্বালানির পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও বড় অংকের ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে স্ক্র্যাপ লোহা ২ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার, গম ২ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার, পাম তেল ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং সয়াবিনবীজ ১ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আমদানি হয়েছে। এছাড়া ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। তুলা, স্ক্র্যাপ, গম, পাম তেল ও সয়াবিনবীজ—এই পাঁচ পণ্য আমদানিতে মোট ৯ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা জ্বালানি পণ্যের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়ে কম।
পাঁচ বছরের ব্যবধানে আমদানি পণ্যের তালিকায় বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের সংখ্যা ছিল ১০টি, যার সম্মিলিত ব্যয় ছিল ১৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। তখন তালিকায় শিল্পের কাঁচামালের প্রাধান্য ছিল বেশি। বর্তমানে বিলিয়ন ডলারের পণ্যের সংখ্যা বেড়ে ১১টি হয়েছে এবং সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ২১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩৭ শতাংশ বা ৫ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।
পুরোনো জাহাজ, সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার ও ফার্নেস অয়েল এখন আর বিলিয়ন ডলারের তালিকায় নেই। এর পরিবর্তে কয়লা, ডিএপি সার, এলপিজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নতুন করে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে আমদানি ব্যয়ের তালিকায় জ্বালানির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে তিনি মনে করেন, আমদানি প্রতিস্থাপক ও কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বাড়লেও তা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তুলাকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো দেশের আমদানি পণ্যের শীর্ষে উঠে এসেছে ডিজেল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংস্থাটির মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের ৪৬টি কাস্টমস স্টেশন দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের মোট ঘোষিত মূল্য ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি বা ৭৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরেও তুলা ছিল ১ নম্বরে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমদানির তালিকা থেকে স্থানীয় আমদানি বাদ দিয়ে প্রকৃত আমদানির হিসাব ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৩১ কোটি বা ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের ডিজেল আমদানি হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তুলার আমদানি মূল্য ছিল প্রায় ৩০৭ কোটি বা ৩ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ তুলার তুলনায় ডিজেল আমদানিতে প্রায় ২৪ কোটি ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো































