ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ক্রেমলিনে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ শান্তি দূতরা। ট্রাম্পের দুই বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার মস্কোয় এই বৈঠক করেন। রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মস্কোর কেন্দ্রস্থলে পুতিনের সরকারি বাসভবনে রুদ্ধদ্বার কক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে এই আলোচনা চলে।
ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, পুতিন দুই মার্কিন দূতকে স্বাগত জানাচ্ছেন। বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতিকে "খুব একটা সহজ নয়" বলে মন্তব্য করেন পুতিন। তবে তিনি জানান, রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছে তা তারা ব্যাখ্যা করবেন। পুতিন ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, "যাই ঘটুক না কেন, এ ধরনের যোগাযোগ নিঃসন্দেহে সবসময় দরকারী।" তিনি প্রতিনিধিদের জানান যে তাদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি "স্বাচ্ছন্দ্য" বোধ করছেন এবং এই কাজের সময় তাদের মধ্যে "বেশ উচ্চ স্তরের আস্থা" রয়েছে। মস্কোয় পৌঁছানোর পর রাশিয়ার কিরিল দিমিত্রিভের সঙ্গে জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে দেখা গেছে।
বৈঠকে দুই দেশের রাজধানীতে তিন দিনের জন্য হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে একমত হওয়ার জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান উইটকফ। ট্রাম্পের দূতদের সফরের কারণে কিয়েভে তিন দিন হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন। তবে পুতিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজধানী কিয়েভের বাইরে ইউক্রেনের অন্যান্য অংশে কোনো যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়নি রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, তিনি এই আলোচনা প্রক্রিয়া এবং মধ্যস্থতাকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
মস্কো সফর শেষে রবিবার ট্রাম্পের এই দুই প্রতিনিধি কিয়েভ সফরে যাবেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শনিবার জানান, তিনি ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা রুশ পক্ষের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। জেলেনস্কি বলেন, "রবিবার কিয়েভে মার্কিন দলের অংশগ্রহণে যে কূটনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে তার পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে। আমরা স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের অপেক্ষায় আছি এবং একটি ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য প্রস্তুত।" তিনি আরও যোগ করেন, "শনিবার শেষ হওয়া থেকে শুরু করে রবিবার ও সোমবার পর্যন্ত ইউক্রেন মস্কোয় হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত এবং আমরা রাশিয়ার কাছ থেকেও কিয়েভের ক্ষেত্রে একই আচরণ আশা করি।"
ইউক্রেনের আকাশসীমা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকেই বন্ধ রয়েছে। ফলে মার্কিন দূতরা কীভাবে মস্কো থেকে কিয়েভে পৌঁছাবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে গত ১৮ মাসে ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলও যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নিয়েছে।
এই সফরের ঠিক আগে কিয়েভ ও বরিস্পিল বিমানবন্দরে রাশিয়ার বিমান হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তিনি একে "প্রদর্শনীমূলক হামলা" আখ্যা দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রতিনিধিরা বিমানে করে ইউক্রেনে আসতে পারেন এবং কিয়েভ বা বরিস্পিল বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেন—এমন আলোচনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই রাশিয়া এই হামলা চালিয়েছে। জেলেনস্কি শুক্রবার বলেছিলেন যে তিনি মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরের সময় রুশ বিমানক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং রাশিয়ার পক্ষ থেকেও ইউক্রেনের জন্য একই নিরাপত্তা দাবি করেন। এর পাশাপাশি তিনি জানান, দিনিপ্রো অঞ্চলে একটি বেসামরিক ভবনে রাশিয়ার রাতভর হামলায় চারজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।
উইটকফ ও কুশনারের এই মস্কো সফরটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যার ঠিক এক সপ্তাহ আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র প্রধান জন র্যাটক্লিফ রাশিয়ার রাজধানীতে একটি বিরল সফর করেছিলেন। তবে এই বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে সে বিষয়ে ওয়াশিংটন বা ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করা হয়নি। গত সপ্তাহে ট্রাম্প এই আলোচনাকে "আধা-নিয়মিত" বলে বর্ণনা করেছিলেন।
এদিকে, প্যারিসে ইউরোপীয় মিত্রদের বৈঠকও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। ভূখণ্ড এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতভেদ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে এবং উভয় পক্ষই বিমান হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেন জানিয়েছে যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটের কারণে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে তারা রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।




























