ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। তার এই প্রস্থান ছিল অত্যন্ত নাটকীয় এবং সংক্ষিপ্ত নোটিশে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ৪ আগস্ট, যখন সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্রায় ১০০ জন নিহত হন। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও প্রাণ হারান। সেদিন বিকেলে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও উপদেষ্টা শেখ হাসিনাকে সতর্ক করে জানান যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
তবে শেখ হাসিনা শুরুতে পরিস্থিতি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পরিস্থিতি আর সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ৫ আগস্ট সকালে গণভবনে তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আইজিপি তাকে জানান, পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে পুলিশের পক্ষে কঠোর অবস্থান ধরে রাখা আর সম্ভব নয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি করানোর জন্য তার বোন শেখ রেহানার সহায়তা নেন। কর্মকর্তারা শেখ রেহানার সঙ্গে আলাদা কক্ষে আলোচনা করে তাকে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বড় বোনকে রাজি করানোর অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে বিদেশে থাকা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে কথোপকথন হয় এবং জয় তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে পদত্যাগের বিষয়ে রাজি করান।
৫ আগস্ট সকাল থেকে কঠোর কারফিউ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। দুপুর ১২টার দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণ আগে মাঠে দায়িত্বরত সেনা কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “শিগগিরই তাদের জন্য ‘সুখবর’ আসছে।” এরপরই শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
গণভবন থেকে হেলিকপ্টারে করে বিমানবন্দরে পৌঁছান শেখ হাসিনা। সেখান থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে করে তিনি ভারতের দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশের হেলিকপ্টারে করে তিনি যদি ভারতের আগরতলায় পৌঁছাতে পারেন, তবে সেখান থেকে তাকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হবে।
শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি ৬ আগস্ট ভারতের লোকসভায় বিস্তারিত তুলে ধরেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি জানান, ৫ আগস্ট বিকেলে শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত নোটিশে ভারতে প্রবেশের অনুমোদন চেয়ে অনুরোধ করেন। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের জন্য বারবার অনুরোধ আসার পর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি দিল্লিতে পৌঁছান।
জয়শঙ্কর লোকসভায় আরও জানান, কারফিউ সত্ত্বেও ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীরা ঢাকা দখলে নেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পরই শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ভারতে পৌঁছানোর পর হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। একই দিনে নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জয়শঙ্কর ও অজিত দোভাল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জয়শঙ্কর বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও বৈঠক করেন।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরদিন ৬ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ভারতে যাওয়ার নাটকীয় সময়ের বর্ণনা দেন জয়শঙ্কর।
তারপরেই তিনি পদত্যাগ করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নেন।
একপর্যায়ে শেখ হাসিনা আইজিপিকে দেখিয়ে বলেন, তারা (পুলিশ) তো ভালো করছে।
তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও যোগ দিতে দেখা যায়।
এরই মধ্যে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামলে বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়।
সকাল থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের ইন্টারনেট সেবা।
তখনই দেশের বিভিন্ন জায়গায় গুঞ্জন ছড়ায় সামরিক শাসন কিংবা জরুরি অবস্থার মতো বিষয়গুলো।
সূত্র: Dhaka Post




























