তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি ঐতিহাসিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। এই চুক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই জোটটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই চুক্তি হয়তো বৃহত্তর একটি আঞ্চলিক জোটের সূচনা করবে, যা ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে উভয় পক্ষ থেকেই সতর্ক থাকবে। আঞ্চলিক হুমকির মুখে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা তুলে ধরতে চাইলেও, চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
‘কিলোওয়েন গ্রুপ’ নামের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখনো মক্কা ঘোষণাটি দেখিনি। আমরা মনে করি, এতে বলা হয়েছে—একজনের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এখানে “বিবেচনা করা উচিত” কথাটিই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর অর্থ “অবশ্যই” নয়।’
বর্তমান বিশ্বে হুমকিগুলো অত্যন্ত প্রকট। ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িত এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আরেক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারতের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি হয়েছে। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সিরিয়া ও ইরাকে অস্থিরতা বেড়েছে।
উলম্যানের মতো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কীভাবে এর তিন স্বাক্ষরকারী দেশকে এসব সংঘাতের কোনো একটিতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। উলম্যান বলেন, ‘ধরা যাক, ইয়েমেনে হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালাল। তাহলে কি তুরস্কও এতে জড়িয়ে পড়বে? এই চুক্তির কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা এখনো অস্পষ্ট।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং পরবর্তী সময়ে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ এর বাইরের অনেক দেশ এখন এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায় এবং পরবর্তী পর্যায়ের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবছে। অনেক রাষ্ট্রই অতীতের মতপার্থক্য পেছনে ফেলে পারস্পরিক হুমকির মুখে বাস্তববাদকেই সামনে নিয়ে আসছে।
তুরস্ক ও সৌদি আরব এর ভালো উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার ঘটনা দুই দেশের মধ্যে গভীর বিরোধের জন্ম দিয়েছিল, যা কয়েক বছর স্থায়ী হয়। কিন্তু ২০২২ সালের মধ্যে রিয়াদ ও আঙ্কারা তাদের অতীতের মতপার্থক্য অনেকটাই পাশে সরিয়ে রেখেছে বলে মনে করা হয়।
সৌদি আরব তখন পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল অনুসরণ করছিল, আর তুরস্ক তার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছিল। এর পরের সময়ে ইসরায়েল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং অঞ্চলটির জন্য নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন ভবিষ্যৎ-ভাবনা সামনে এনেছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির লক্ষ্য হলো তিন দেশ যেসব হুমকির মুখোমুখি হতে পারে, তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা। আল–জাজিরার সংবাদদাতা ওসামাহ বিন জাভাইদ যেমনটি উল্লেখ করেছেন, এই জোটে প্রতিটি দেশই ভিন্ন ধরনের শক্তি নিয়ে এসেছে।
বিন জাভাইদ বলেন, ‘এই দেশগুলোর প্রতিটি নিজস্ব সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। পাকিস্তান এনেছে যুদ্ধে অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত এবং পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার—যা কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে একমাত্র।’ তিনি বলেন, ‘তুরস্ক, ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে, এনেছে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম।’
নতুন সামরিক জোট এবং হুমকির বিরুদ্ধে নতুন ধরনের প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের কারণে। সৌদি আরব এবং তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায় তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের ওপর নিরাপত্তার জন্য নির্ভরশীল ছিল।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার যে ইসরায়েল, তা স্পষ্ট বলেই মনে হচ্ছে। ফলে অন্যান্য মিত্রকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা আগ্রহী থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উলম্যান বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, মিত্রদের নিজেদেরই নিজেদের রক্ষা করতে হবে।’
ইসরায়েল ও ইরান নিজেদের আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে তুলে ধরলেও মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো জোটটিকে কোনো বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে গঠিত বলে উপস্থাপনের ব্যাপারে সতর্ক থেকেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল ও ইরানের কাছ থেকে আসা ঝুঁকি মোকাবিলাই এই জোটের মূল উদ্দেশ্য।
বিন জাভাইদ বলেন, ‘তিনটি দেশের জন্যই ইসরায়েল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। এই হুমকির তালিকায় ইরানের অবস্থানও খুব কাছাকাছি—বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য, ওয়াশিংটনের স্বার্থে তেহরানের হামলার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।’
এই অঞ্চলের অনেকের কাছে ইসরায়েল—যে দেশ একসময় সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল—২০২৩ সালের পর থেকে এমন আচরণ করেছে, যাতে মনে হয়েছে আলোচনার চেয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসাতেই দেশটির বেশি আগ্রহ রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সম্প্রতি একটি উদীয়মান ‘সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে বিপদের কথা বলতে শুরু করেছেন, যদিও এর মাধ্যমে তিনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন, তা ব্যাখ্যা করেননি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত একটি নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান ইতিমধ্যে সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীও দেশটির ওপর হামলা করেছে। এর জবাবে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকে হামলা চালিয়েছে। এই জটিল সমীকরণে মক্কা চুক্তি কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দেশটি ১৩ বছরের ভয়াবহ সংঘাতের পর এখন যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
একইভাবে, মিসরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তার প্রধান মনোযোগ অর্থনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা এড়ানোর দিকে।
এই চুক্তি তাদের জোটের কোনো অংশীদার আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের কতটা বাধ্যতামূলকভাবে তার পক্ষে যুদ্ধে নামতে হবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই অননুমেয় হয়ে ওঠায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন বিকল্প পথের সন্ধান করছে।
আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে আমাদের মিত্ররা এখন অন্যত্র সহযোগিতা খুঁজছে।’
এ ধরনের একটি জোটের সম্ভাব্য সুফল অবশ্য সহজেই বোঝা যায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এ কারণেই তারা ইসরায়েল ও ইরানের কাছ থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারেনি।
ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে সিরিয়ার অবস্থান এমন একটি চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটিকে দ্বিধায় ফেলতে পারে, যা ইসরায়েলের কাছে নেতিবাচকভাবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অতীতে আঞ্চলিক নৌপথে জাহাজ চলাচল সুরক্ষার জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি সামুদ্রিক জোটে যোগ দিতেও মিসর দ্বিধা করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সম্পর্কের এই জটিলতাই চুক্তির পর একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার যেকোনো বয়ানের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো স্পষ্ট করে।
এই জোটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন এটি সত্যিকারের পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
আর সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট করে দেবে, সত্যিই একটি তৃতীয় আঞ্চলিক অক্ষ আত্মপ্রকাশ করছে কি না।
আবুবকর আল-শামাহি আল–জাজিরা ডটকমের একজন সম্পাদক
সূত্র: প্রথম আলো






























