তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান মক্কায় একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে এই অঞ্চলে একটি নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি। এটি মূলত সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এক বছর আগে স্বাক্ষরিত একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই চুক্তিটি ভবিষ্যতে আরও অন্যান্য দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সম্প্রসারিত হতে পারে। এর ফলে এটি সম্মিলিত নিরাপত্তা এবং প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করতে সক্ষম হবে। তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং এর পরিধি কতদূর বিস্তৃত হবে, তা নিয়ে এখন নানা মহলে আলোচনা চলছে।
এই চুক্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ন্যাটো-সদৃশ একটি বিধান, যেখানে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। যদিও এই বিধানের বিস্তারিত রূপরেখা এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে কী ধরনের সহায়তা বা সমর্থন প্রয়োজন হবে, তা মিত্র দেশগুলো আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।
ফিদান আরও স্পষ্ট করেছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ অন্য কোনো দেশকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। তুরস্ক ও সৌদি কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই চুক্তিটি অন্য কোনো কৌশলগত জোট বা সম্পর্ককে প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়। তুরস্ক, যারা ন্যাটোর সদস্য, তারা জানিয়েছে যে এই চুক্তিটি ইরানসহ অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি।
এই চুক্তিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে এখন পর্যন্ত কেবল মিশরের নামই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সদস্য দেশের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিশরকে একটি “ন্যাচারাল পার্টনার” বা স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, কিছু “টেকনিক্যাল ইস্যু” বা প্রযুক্তিগত সমস্যা মিটে গেলেই কায়রো আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দেবে।
ফিদান আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি পরবর্তী ধাপে মিশরও আমাদের এই জোটে থাকবে। আমরা ইতিমধ্যে একে অপরের সাথে এমনভাবে কাজ করছি যেন আমরা জোটের সদস্য।” কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক অধ্যাপক আলী বাকির মনে করেন, মিশরের অন্তর্ভুক্তি এই জোটের রাজনৈতিক গুরুত্ব, আঞ্চলিক প্রভাব এবং কার্যকর সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
মিশর ইতিমধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের সাথে একটি শক্তিশালী কর্ম সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারা ‘আর৪’ নামক একটি গ্রুপের অংশ হিসেবে আঞ্চলিক বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ করে থাকে। ২০১৩ সালে মিশরের সামরিক অভ্যুত্থান, লিবিয়ার সংঘাত এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার নিয়ে তুরস্কের সাথে পূর্বের উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও, সম্প্রতি কায়রো ও আঙ্কারার মধ্যে সামরিক সম্পর্ক বেশ জোরদার হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কায়রো এই ধরনের একটি বাধ্যতামূলক প্রতিরক্ষা চুক্তির সামরিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কারণ, এই জোটের অন্য দেশগুলোর স্বার্থ সবসময় মিশরের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। এছাড়া মিশরের বিদ্যমান শান্তি চুক্তিগুলোর ওপর এর প্রভাব নিয়েও দেশটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকতে পারে।
চ্যাথাম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের সহযোগী ফেলো করিম এলগেন্ডি আল জাজিরাকে বলেন, “মিশর কেবল তখনই যোগ দিতে পারে যদি চুক্তির ভাষা ওয়াশিংটনের সাথে তাদের সহায়তা সম্পর্ককে সুরক্ষা দেয়, বিদ্যমান জোট ও শান্তি চুক্তিগুলোকে দুর্বল না করে এবং কখন ও কোথায় তারা লড়াই করবে তা নির্ধারণের স্বাধীনতা বজায় রাখে।”
এলগেন্ডি আরও বলেন, “যদি এই চুক্তিটি একটি রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে থাকে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য আলোচনার সুযোগ থাকে, তবে কায়রো এটি মেনে নিতে পারে। কিন্তু যদি এটি এমন বাধ্যবাধকতায় রূপ নেয় যা মিশরীয় বাহিনীকে অন্যের যুদ্ধে টেনে আনতে পারে, তবে তাদের উত্তর সম্ভবত নেতিবাচক হবে।” তার মতে, মিশরের জন্য প্রযুক্তিগত বাধাগুলো আইনি এবং অপারেশনাল—উভয়ই হতে পারে।
আহমেদ আবুদৌহ, চ্যাথাম হাউসের আরেক সহযোগী ফেলো, মনে করেন যে মিশর যদিও এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির নিরাপত্তা উদ্বেগের সাথে একমত, তবুও তারা এই জোটের অন্তর্নিহিত হুমকি উপলব্ধির সাথে পুরোপুরি একমত নয়। তিনি বলেন, কায়রো বরং ছোট পরিসরের এবং নির্দিষ্ট ইস্যু-ভিত্তিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকতে বেশি আগ্রহী।
অধ্যাপক আলী বাকির মনে করেন, কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও এই জোটে যোগ দিতে পারে। তিনি কাতারকে এই জোটের জন্য সবচেয়ে “স্বাভাবিক” অংশীদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং কুয়েতকেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আজারবাইজান, সিরিয়া এবং জর্ডানও তুলনামূলক দ্রুত এই জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এটি একটি ‘ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট’ হিসেবে গড়ে উঠছে, যা প্রতিটি দেশের নিজস্ব ঝুঁকি বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সম্প্রসারিত হবে।
সূত্র: আল জাজিরা


























