হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। একই সময়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তেহরান সফর করছেন। অন্যদিকে, ওমান উপসাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কোনো সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে একটি শান্তি চুক্তি খুব কাছাকাছি।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নবনিযুক্ত প্রধান মোহসেন রেজায়ি তেহরানে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত কং পেইউয়ের সঙ্গে আলাপকালে স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটনকে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং বিদেশে আটকে রাখা ইরানের অর্থ ফেরত দিতে হবে। তবেই হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রেজায়ি রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন, “যতদিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আচরণ পরিবর্তন না করবে এবং ইরানের শর্তগুলো মেনে না নেবে, ততদিন হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা হবে না।”
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় রেজায়ি আরও জোর দিয়ে বলেন, “ইরানের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার। যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও নৌ-অবরোধ বন্ধ না করবে, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত না করবে এবং লেবানন ও গাজাসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হবে, ততক্ষণ এই প্রণালী বন্ধই থাকবে। সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এটি খোলা হবে না।” এই বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প পুরো সংঘাত জুড়ে কখনো উত্তেজনা বৃদ্ধির হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো আসন্ন শান্তি চুক্তির আশ্বাস দিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। সোমবার রাতে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই অনিশ্চয়তা আরও কিছুদিন চলতে পারে। তিনি বলেন, তিনি হয়তো পরিস্থিতি এভাবেই চলতে দেবেন যাতে ইরান অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়, অথবা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানবেন। ট্রাম্প বলেন, “আমি এক ধরনের দরকষাকষি করছি। তারা খুবই ধূর্ত আলোচক।”
তেহরানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেছে। চলমান সংঘাত নিরসনে পাকিস্তান মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে বলেই নাকভির এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে কাতার জানিয়েছিল যে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা বেশ এগিয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, “আমরা গত কয়েক দিনে উভয় রাজধানী থেকেই ইতিবাচক বক্তব্য শুনেছি। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো প্রণালীটি খুলে দেওয়া, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আলোচনার দিকে এগিয়ে যাওয়া।” তবে ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি হলেও তা এই জলপথ খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতেই ইরান প্রণালীটি বন্ধ রেখেছে।
আয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, “যদিও তারা ওমানের সঙ্গে জাহাজের যাতায়াত নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে, তবুও তারা তা বাস্তবায়ন করতে চাইছে না। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, যারা তাদের মতে গত দুই বছরে দুবার তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “তারা মূলত কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না হয়।”
মঙ্গলবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজের স্টিয়ারিং গিয়ার অকেজো করতে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি এমএইচ-৬০ হেলিকপ্টার দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তাদের দাবি, জাহাজটি ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ অমান্য করার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। অন্যদিকে, ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে হুতিদের সন্দেহভাজন হামলায় একটি ছোট কার্গো জাহাজের চার নাবিক নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনের কোস্টগার্ড জানিয়েছে, হুতিবিরোধী সামরিক গোষ্ঠীর দুজন উদ্ধারকারীও এতে নিহত হয়েছেন।
মিশরীয় মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ জাহাজে এই প্রাণহানির ঘটনাটি ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর হুতিদের প্রথম কোনো প্রাণঘাতী হামলা। হুতিদের পরিচালিত সাবা নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে যে, তারা বাব আল-মান্দেবে সৌদি আরবের সামরিক সরঞ্জামবাহী একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে জাহাজটির নাম প্রকাশ করা হয়নি এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ইরানও ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে মার্কিন সম্পদ ও অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরানে অন্তত ৩,৫২৭ জন নিহত এবং ২৭,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এছাড়া অন্তত ১৮ জন মার্কিন নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সর্বশেষ সামরিক অভিযানে ৪,৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১২,০০০-এর বেশি আহত হয়েছে। ইসরায়েলে ইরান ও হিজবুল্লাহর হামলায় অন্তত ৬০ জন নিহত হয়েছেন।
সূত্র: আল জাজিরা































