চলতি ২০২৬ সালে জলবায়ু সংকটের কারণে ইউরোপ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট কার্বন দূষণ বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ালেও, ইউরোপ অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এই গ্রীষ্মে তীব্র দাবদাহের কারণে মহাদেশটিতে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সাধারণত সমুদ্রের তুলনায় স্থলভাগ দ্রুত উষ্ণ হয়, তাই সব মহাদেশই সমুদ্রের চেয়ে দ্রুত গরম হচ্ছে। তবে ইউরোপ চারটি বিশেষ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল: পরিবর্তিত আবহাওয়ার ধরন, আর্কটিক অঞ্চলের নৈকট্য, বরফের আস্তরণ কমে যাওয়া এবং বায়ুদূষণের মাত্রা হ্রাস। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারের আগের তুলনায় বর্তমানে ইউরোপের তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, যা বৈশ্বিক গড় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে প্রতি দশকে তাপমাত্রা ০.৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ছে, যেখানে উত্তর আমেরিকায় এই হার ০.৪২ ডিগ্রি, আফ্রিকায় ০.৩৬ ডিগ্রি এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ০.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের ফলে ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহের হার ও তীব্রতা বেড়েছে। জুন ২০২৬-এ এক বিশাল এলাকা জুড়ে 'হিট ডোম' বা তাপীয় বলয় তৈরি হওয়ার ফলে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দাবদাহ দেখা দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের ড. সামান্থা বার্জেস জানিয়েছেন, গত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলের চাপে যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে তা প্রাকৃতিক নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। এর পেছনে উচ্চস্তরের বাতাস বা জেট স্ট্রিমের পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আর্কটিক অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হওয়া এলাকা, কারণ সেখানকার সাদা বরফ সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করতে পারে না। বরফ গলে যাওয়ার ফলে সমুদ্রের গাঢ় রঙের পানি আরও বেশি তাপ শোষণ করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ইউরোপের একটি বড় অংশ আর্কটিকের কাছে হওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে। এছাড়া অতীতে ইউরোপের শীতকালীন তুষারপাতও সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে মহাদেশটিকে শীতল রাখত। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইউরোপের বরফের চাদর ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কম ছিল, যা ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ার মোট আয়তনের সমান।
বায়ুদূষণ কমানো জনস্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হলেও, এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। দূষণকারী কণা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে শীতল রাখতে সাহায্য করত। এখন বায়ু পরিষ্কার হওয়ায় গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে আটকে থাকা তাপ আরও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। ড. বার্জেসের মতে, মৌসুমভেদে এই কারণগুলোর গুরুত্ব ভিন্ন হয়; যেমন শরৎ ও শীতকালে আর্কটিকের প্রভাব এবং গ্রীষ্মকালে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তীব্র দাবদাহ ছাড়াও এই দ্রুত উষ্ণায়ন দাবানল, খরা, শক্তিশালী ঝড় ও বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল জুলাইয়ের শেষে জানিয়েছেন, এই সংকটের মানবিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় জাতীয় জরুরি অবস্থার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি কয়লা, তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।






























