তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য, দু’বারের সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বর্তমানে ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এই জ্যেষ্ঠ নেতা সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের মুখোমুখি হয়ে তাঁর পালিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর গল্প এবং দলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকারে নানক জানান, ৪ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনি গণভবনে ছিলেন। পরদিন ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তিনি তাঁর শোয়ার জায়গায় প্রায় অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন। ওই সময় বিমান বাহিনীতে কর্মরত তাঁর এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ফোন করে জানান যে শেখ হাসিনা নিরাপদে সীমান্ত পার হয়েছেন। এরপরই নানক ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন এবং একের পর এক আশ্রয় পরিবর্তন করতে থাকেন। গ্রেপ্তারের এড়াতে তিনি নিজের ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলো ফেলে দেন। পরবর্তীতে তাঁর চিকিৎসক জামাতার নির্দেশনায় ও সহযোগিতায় তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর ১৬ আগস্ট তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের শিলংয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে মালদহে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া তাঁর মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দেখা করে পরের দিন কলকাতায় চলে যান। নিজের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ (1969) সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন থেকে।
নানক আরও বলেন, এরপর ১৯৭৫ (1975) সালের ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেদিন যে অশুভ শক্তির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ বা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির কারণে তখন থেকেই কিন্তু তাঁদের আত্মগোপনে জীবন কাটাতে হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে নানক বলেন, সেদিন যদি তিনি দেশ ছাড়তে ৩০ মিনিট দেরি করতেন, তবে শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে নির্মম ও নৃসংশভাবে হত্যা করা হতো। শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলেই আজ ১৮ কোটি মানুষ মনে করছে তাঁর বিকল্প কোনো নেতৃত্ব দেশে নেই। বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে ভালো আছেন এবং ভারত সরকার তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর প্রোটোকল ও নিরাপত্তা দিচ্ছে বলে জানান নানক। তিনি আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনা যদি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন, তবে তাঁর আগেই তিনিসহ অন্য নেতারা বাংলাদেশে পৌঁছাবেন।
নিজের বীরত্বপূর্ণ অতীতের কথা তুলে ধরে নানক বলেন, ১৯৭১ (1971) সালে তিনি পাকিস্তানি পাঞ্জাবী বাহিনীর বিরুদ্ধে একেবারে ফ্রন্ট ফাইট করেছেন। আওয়ামী লীগের পতনের নেপথ্যে একটি গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল দাবি করে নানক বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর ছয় মাস আগেই সতর্ক করেছিলেন যে 'সাদা চামড়াওয়ালারা' তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায় এবং ড. ইউনূস এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রশ্নে নানক বলেন, সরকার পতনের দিন চাইলে তাঁরাও ঢাকা ও আশপাশের কেরাণীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষের জমায়েত করতে পারতেন। কিন্তু শেখ হাসিনা চাননি কোনো রক্তপাত বা লাশ পড়ুক, তাই তিনি ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং কোনো সংঘাতে জড়াতে নিষেধ করেছিলেন।
কলকাতায় আওয়ামী লীগের কোনো গোপন কার্যালয় থাকার খবরকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে নানক জানান, কলকাতায় কোনো অফিস নেই, তবে মাঝেমধ্যে নেতারা কোথাও বসে সময় কাটান। দূর থেকেই তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর) এর নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। জেলে থাকা কর্মীদের পরিবারের দেখভাল করছেন তাঁর মেয়ে, যিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের মা ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক।
জুলাই আন্দোলনে মোহাম্মদপুরে ৯ জন নিহতের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে নানক বলেন, তিনি একজন আইনজীবী হিসেবে আইনিভাবেই এই লড়াই লড়ছেন। মামলার নথিতে শুধু তাঁর নির্দেশের কথা বলা হলেও কোনো সাক্ষী তাঁকে সশরীরে দেখেননি। তিনি দাবি করেন, বিচারালয় যদি নিরপেক্ষভাবে চলে, তবে শেখ হাসিনাসহ তাঁদের বিরুদ্ধে হওয়া কোনো মামলাই টিকবে না। অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নানক বলেন, জাতিসংঘ বাহিনীর অধীনেও যদি নির্বাচন হয় এবং তাতে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে তাঁরা সবাই একসঙ্গে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন।




























