নতুন সিনেমা ‘অ্যান্ড সানস’ মুক্তি উপলক্ষে নিজের ফেলে আসা অতীত, অভিনব অভ্যাস এবং তরুণ বয়সের লেখক হওয়ার ব্যর্থ স্বপ্ন নিয়ে মুখ খুলেছেন ৭৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ অভিনেতা বিল নাই। ছবিতে তিনি এ এন ডায়ার নামের এক খামখেয়ালী ও একাকী ঔপন্যাসিকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই চরিত্রের সূত্র ধরেই বাস্তব জীবনে নিজের লেখক হওয়ার সুপ্ত বাসনা এবং তা পূরণ করতে গিয়ে প্যারিসের রাস্তায় ভিক্ষা করার গল্প শুনিয়েছেন তিনি।
সিনেমায় ডায়ার একজন মুমূর্ষু অভিভাবক, যিনি এক নাটকীয় ঘোষণার জন্য তাঁর সন্তানদের ডেকে পাঠান। ছবিতে ডায়ারের চরিত্রে বিল নাইয়ের পাশাপাশি তাঁর বড় সন্তানদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনি ফ্লিন ও জর্জ ম্যাককে। এছাড়া তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীর ভূমিকায় রয়েছেন ইমেল্ডা স্টনটন, যিনি অন্য নারীর গর্ভে ডায়ারের সন্তান (হ্যামনেট খ্যাত নোয়া জুপ) জন্ম দেওয়ার বিষয়টি কখনোই মেনে নিতে পারেননি। সিনেমায় ডায়ারের চরিত্রটি অত্যন্ত রূঢ় এবং সন্তানদের প্রতি দায়িত্বহীন এক বাবার। তবে নিজের সাহিত্য প্রতিভার দোহাই দিয়ে তিনি সেই আচরণকে জায়েজ করতে চান। বাস্তব জীবনে অবশ্য বিল নাই এমন যুক্তিকে একেবারেই প্রশ্রয় দেন না। তিনি বলেন, মাঠে ফুটবলাররা খারাপ আচরণ করলে মানুষ যেমন সেটিকে তাঁর প্রতিভার অংশ বলে চালিয়ে দিতে চায়, এটিও ঠিক তেমনই একটি অগ্রহণযোগ্য অজহুত।
বাস্তব জীবনে বিল নাইয়ের একটি মেয়ে রয়েছে—অভিনেতা ও পরিচালক মেরি নাই। মেরি তাঁর সাবেক সঙ্গী ডায়ানা কুইকের সন্তান, যাঁর সঙ্গে বিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর কাটিয়েছেন। বর্তমানে দুই নাতি-নাতনির দাদা বিল জানান, সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে তাঁর নির্দিষ্ট কোনো দর্শন ছিল না। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুল করতে করতে এবং তা সংশোধন করেই তিনি অভিভাবকত্ব শিখেছেন। তাঁর নিজের বাবা-মা কখনো তাঁর ওপর জোর খাটাতেন না বা নির্দয় ছিলেন না, তিনিও তেমনটাই হতে চেয়েছিলেন।
সিনেমায় একজন ঔপন্যাসিকের চরিত্রে অভিনয় করা বিল নাইয়ের জন্য বেশ আবেগঘন ছিল, কারণ তরুণ বয়সে তিনি নিজেই একজন লেখক হতে চেয়েছিলেন। ১৪ বছর বয়সে তাঁর ক্যাথলিক গ্রামার স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক মিস্টার উইয়ার তাঁকে উপন্যাস লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা তাঁর মাথায় জেঁকে বসেছিল। তিনি হেমিংওয়ে ও ফিটজেরাল্ডের মতো লেখকদের আদর্শ মানতেন। ১৫ বছর বয়সে শিকার ও মাছ ধরা বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ফিল্ড’-এ কাজ করার সময় তিনি মেয়েদের টয়লেটের রোলার টাওয়েল পরিবর্তনের দায়িত্ব পান, যেখানে টাইপিস্ট মেয়েরা তাঁকে লজ্জা দিয়ে মজা পেতেন। একবার রাস্তায় একটি বেন্টলি গাড়ি দেখে উত্তেজনায় লাফাতে থাকায় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে বকাও খেয়েছিলেন তিনি।
এর পরপরই তিনি লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্যারিসে পাড়ি জমান। বিল নাই বলেন, তিনি ছিলেন আর দশটা সাধারণ তরুণের মতোই। প্যারিসের বিখ্যাত ‘শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি’ বইদোকানের সামনে ঘুরে ঘুরে ভালো কিছু বাক্য লেখার চেষ্টা করতেন এবং প্রেমিকা খুঁজতেন। কিন্তু তার কোনোটিই হয়নি। একপর্যায়ে ট্রোকাডেরো চত্বরে ভিক্ষা করতে বাধ্য হন তিনি। পরে একজনের পরামর্শে নাটকের স্কুলে ভর্তি হন এবং লেখালেখির স্বপ্নটি অলসতার কারণে আড়ালে চলে যায়। অভিনয় জীবনে তাঁর অন্যতম প্রাথমিক সাফল্য ছিল ১৯৯১ (1991) সালের বিবিসি-র সাহসী সিরিজ ‘দ্য মেনস রুম’ (The Men’s Room), যেখানে একজন কামুক অধ্যাপকের চরিত্রে তাঁর খোলামেলা দৃশ্যগুলো ব্রডকাস্টিং স্ট্যান্ডার্ডস কাউন্সিলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
বাস্তব জীবনে বেশ কিছু অদ্ভুত অভ্যাস মেনে চলেন বিল নাই। তিনি জুম কল একেবারেই পছন্দ করেন না এবং তা থেকে অবসর নিয়েছেন। কাজের ফাঁকে দুপুরের খাবার বা ‘ওয়ার্কিং লাঞ্চ’ তিনি কঠোরভাবে এড়িয়ে চলেন। এছাড়া অভিনয়ের ক্ষেত্রে ‘টোগা’ (প্রাচীন রোমান পোশাক) পরতে হয় এমন যেকোনো চরিত্র তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। একসময় ইমোজির বিরোধী হলেও এখন তিনি কিছু নির্দিষ্ট ইমোজি ব্যবহার করেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্লেমিংগো, বেগুনি ডালিয়া, লাফিয়ে ওঠা হাঙর ও ডলফিন এবং কাউকে অভিনন্দন জানাতে গলফারের ইমোজি। তবে স্মাইলি ফেস বা হাসিমুখের ইমোজি তিনি একেবারেই ব্যবহার করেন না।
বর্তমানে তাঁর কোনো উপন্যাস প্রকাশের অপেক্ষায় না থাকলেও, এক ধরণের মৌখিক স্মৃতিকথা উন্মোচিত হচ্ছে তাঁর ‘ইল-অ্যাডভাইজড’ (Ill-Advised) পডকাস্টের মাধ্যমে। প্রতি পর্বে ২৫ (25) মিনিট করে চলা এই পডকাস্টে তিনি একজন শান্ত স্বভাবের পরামর্শদাতার মতো শ্রোতাদের ফ্যাশন থেকে শুরু করে সামাজিক ভুলত্রুটি এড়ানোর মতো নানা বিষয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে উত্তর দেন। বর্তমানে তৃতীয় সিজন শুরুর অপেক্ষায় থাকা এই পডকাস্টটি প্রতি মাসে ৩০০,০০০ (300000) জনেরও বেশি শ্রোতা শোনেন এবং এটি ব্রডকাস্টিং প্রেস গিল্ড কর্তৃক ২০২৬ সালের সেরা পডকাস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নিজের এই সাফল্যে অত্যন্ত বিনয়ী বিল নাই তাঁর প্রিয় তারকা স্টিভ ম্যাককুইন এবং গায়ক প্রিন্সের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কোনো রকম বাড়াবাড়ি ছাড়াই শান্ত ও সংযতভাবে নিজের কাজ করে যেতে চান।






























