মাদক কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ১১৬ জন গডফাদারের ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি)। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা ৩৯টি মামলার অধীনে এই বিপুল সম্পত্তি পর্যায়ক্রমে বাজেয়াপ্ত করা হবে। সিআইডি ইতোমধ্যে ২৪টি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করেছে এবং বাকি ১৫টি মামলার তদন্তও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অপরাধীদের মূলোৎপাটনে সারা দেশে আরও ৬৮টি পৃথক অনুসন্ধান চালিয়ে গডফাদারদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন জানান, মাদক কারবারিদের নিষ্ক্রিয় করতে অবৈধ আয়ে গড়া তাদের সম্পদ ক্রোক করে সরকারের অনুকূলে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২৪টি মামলায় আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তদন্তাধীন মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামি আত্মগোপনে থাকলেও তাদের সম্পদ ক্রোকে আইনি কোনো বাধা নেই এবং আদালতের অনুমতিক্রমেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ১১৬ জন অপরাধীর পাচার করা অর্থের পরিমাণ ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৩৫ একর জমি, ১২টি বাড়ি ও ১টি গাড়ি শনাক্ত হয়েছে, যার বাজারমূল্য ৩৭ কোটি ৩ লাখ টাকা। এছাড়াও ১ কোটি ৯৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। ৩৯টি মামলার মোট আসামির মধ্যে এজাহারভুক্ত ৭০ জন, যাদের মধ্যে বর্তমানে ১৪ জন গ্রেফতার এবং ২০ জন জামিনে রয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাঠপর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের গ্রেফতারের চেয়ে পর্দার আড়ালে থাকা পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা বেশি জরুরি। তিনি বলেন, অনেকে অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে, যা অভিযান ও আইনি ব্যবস্থায় যাতে প্রভাব না ফেলে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা মহানগরীতে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউর নজরে আসা অস্বাভাবিক লেনদেনের নথি পর্যালোচনা করে ইয়াবা গডফাদার মো. কতুব উদ্দিনের ৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা পাচারের সন্ধান পায় সিআইডি। এছাড়া প্রযোজক নজরুল ইসলাম ওরফে রাজের আড়াই কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে। আদাবর থানার মামলায় মো. নুরুল ইসলাম ও রাজিয়া ইসলামের ১৩ কোটি টাকার বাড়ি, জমি ও স্বর্ণালংকার শনাক্ত হয়েছে, তবে তারা হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছেন। গুলশান থানার মামলায় মো. আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০১৮ সালে কোস্ট গার্ডের ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা কেন্দ্র করে অনুসন্ধানে নেমে ৬ গডফাদারের সন্ধান পায় সিআইডি। তাদের ১ কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্তরা হলেন- গাজী মোহাম্মদ ছৈয়দুল হক, মো. মোজাহার মিয়া, মো. নবী হোসেন, আ. রশিদ মিয়া, মেহেদী হাসান শাকিল, মো. সেলিম, মো. ইদ্রিস, মো. নুরুল আলম এবং তদন্তে প্রাপ্ত পারভেজুল। একই এলাকায় মো. হাছান ওরফে হাছান মাঝি ও মো. ছাবেরুল ইসলামের পাচার করা অর্থ ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। এছাড়া অন্য মামলায় মো. জসিম উদ্দিন, মো. ফরিদুল আলম ওরফে মেহেদী হাসান, মো. রবিউল আলম, মো. সিদ্দিক আহমেদ, সৈয়দ আহমেদ ওরফে সৈয়দ হোসাইন, মো. আব্দুল মালেক ওরফে মালেক হোছাইন ও শফিকুল ইসলাম ওরফে সামসুলের বিরুদ্ধে দেড় কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজারের টেকনাফে শফিক আলম ওরফে শফিক ২০২১ সালে সিআইডির মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। তদন্তে তার ৯টি ব্যাংক হিসাবে ৪০ কোটি ১৪ লাখের বেশি টাকা লেনদেনের তথ্য এবং ৭০০ শতাংশ জমি ক্রোক করা হয়েছে যার মূল্য ৫ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি। নুরুল হক ওরফে ভুট্টোর বিরুদ্ধে করা মামলায় ৪২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে আড়াই কোটি টাকা মূল্যের ২ একর জমি ক্রোক হয়েছে। মো. আলীর বিরুদ্ধে ১৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে। পলাতক মো. ফজর আলী, গনি মিয়া ও গ্রেফতার আব্দুর রহিমের পাচার করা অর্থ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সাবেক এমপি বদির ভাই আব্দুস শুক্কুরের বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া নুরুল হুদা, মো. আরশাদ, নুরুল কবির ও মোহাম্মদ রমজান পাচার করেছে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এনামুল হক ওরফে এনাম মেম্বার ও আ. গফুর মিয়ার ২৫ লাখ টাকা, মো. একরামের ২ কোটি ৪১ হাজার টাকা, শাহ আজমের ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, সৈয়দ আলমের ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, আব্দুর রহমানের ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, মো. জামাল হোসেনের ৭৬ লাখ টাকা, শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিকে ১ কোটি টাকা ও ফয়সাল রহমানের ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে। এছাড়া নুরুল কবিরের ১১ কোটি ৫ লাখ, আমিনুর রহমানের ২ কোটি টাকা, নুরুল আলম, ফরিদুল আলম, মোহাম্মদ তৈয়ব, মো. আক্তার কামাল ও মোহাম্মদ হাসানের ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং মো. শফিক আলম ওরফে শফিক, মো. মনির আলম, মো. রফিক আলম ও আব্দুল গফুরের ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য মিলেছে।
গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানায় মো. ফোরকান হোসেনের বিরুদ্ধে ১৯ লাখ টাকার বেশি অর্থ পাচার মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকার পারুলের ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, মোসা. আসমা, রেশমা খাতুন, লিজা বেগম ওরফে লিপি আক্তার, মো. মানিক মিয়া, মো. কামাল উদ্দিন ও জাহানারা বেগমের ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা এবং মোসা. রুনা আক্তার, মো. সুমন মিয়া ও মো. রিফাত ওরফে দুর্জয়ের ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে গাজীপুর সদর এলাকার মো. হাসেম ও মধুর ২ কোটি ৭ লাখ টাকার সম্পদ শনাক্ত করেছে সিআইডি। নারায়ণগঞ্জ এলাকার সীমা বেগম ও মিন্টু মিয়ার ৪৩ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ শনাক্ত হয়েছে।
খুলনা মহানগরীর মো. শাহজাহান হাওলাদারের বিরুদ্ধে আড়াই কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ফরিদপুরের মিঠুন সরকারের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে মধুখালী থানায় মামলায় ৪৮ লাখ টাকা পাচারের প্রমাণ মিলেছে। ২০২২ সালে কোতোয়ালি থানার মামলায় মো. মাসুদ পারভেজের ৪ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া যায়। বিএফআইইউর নথিতে বগুড়ার মো. তুফান সরকারের ৩৩ লাখ টাকা পাচারের তথ্য মিলেছে। নওগাঁর পত্নীতলা থানার মামলায় পলাতক মো. এনামুল হক ওরফে সেন্টু ও মো. ডালিম ৯ লাখ ৪৫ লাখ টাকা পাচার করেছেন। কুমিল্লার মুরাদনগর থানার মামলায় মো. গোলাম কিবরিয়াসহ ৩ আসামি ৬০ লাখ টাকা পাচার করেছে এবং পাবনার আতাইকুলা এলাকার শাহীন আলমের ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার সম্পদ ক্রোক করেছে সিআইডি।




























