ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় ফ্লোরেস দ্বীপে ৭.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এই ভয়াবহ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হলে হাজার হাজার বাসিন্দা আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করেন।
মার্কিন এবং ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অগভীর এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তর উপকূলে, উপকূলীয় শহর এন্ডে থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। ভূমিকম্পের পরপরই ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী আফটারশক বা অনুকম্পন অনুভূত হয়, যার মধ্যে একটির মাত্রা ছিল ৬.১। ভূমিকম্পের তীব্রতায় সবচেয়ে কাছের এলাকা নাগেকেও রিজেন্সির বাসিন্দারা সমুদ্রের পানি নেমে যেতে দেখে সুনামির আশঙ্কায় দ্রুত উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে থাকেন। তবে পরবর্তীতে সুনামির এই সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
ভূমিকম্পের সময়কার আতঙ্ক বর্ণনা করে মাউমেরে শহরের বাসিন্দা ও হাসপাতালের কাস্টমার সার্ভিস কর্মকর্তা লুকাস লোটার (৩১) এএফপিকে বলেন, "হঠাৎ করেই সবকিছু কাঁপতে শুরু করে এবং আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে রোগীরাও হাসপাতাল ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমি হাসপাতালের কিছু দেয়ালে ফাটল ধরতে দেখেছি।" নাগেকেও-এর ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা ইয়োহানেস বাবো জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি বাজারে ছিলেন। তিনি বলেন, "কম্পন খুবই তীব্র ছিল। ভাগ্যিস আমরা তখন ঘরের বাইরে ছিলাম। মানুষ আতঙ্কে এদিক-ওদিক ছুটছিল। আমরা আপাতত পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছি। আমার পরিবারের সবাই নিরাপদে আছে।"
ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিদ্যা সংস্থা (বিএমকেজি) সুনামি তরঙ্গের আশঙ্কার কথা জানিয়ে ফ্লোরেস দ্বীপের উত্তর উপকূল এবং দক্ষিণের দ্বীপগুলোর বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানায়। জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা (বিএনপিবি)-এর কর্মকর্তা আব্দুল মুহারি স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম কম্পাস টিভিকে বলেন, "আমরা উত্তর উপকূল ও দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য জোরালো অনুরোধ জানাচ্ছি।" তিনি বাসিন্দাদের উপকূল থেকে অন্তত দুই কিলোমিটার ভেতরে অথবা ১০ মিটারের চেয়ে বেশি উঁচু পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বিএমকেজি-এর ভূমিকম্প ও সুনামি বিভাগের পরিচালক উইজায়ান্তো জানান, পূর্ব নুসা টেঙ্গারা, দক্ষিণ সুলাওয়েসি এবং পশ্চিম নুসা টেঙ্গারা প্রদেশে ০.৫ মিটার থেকে ৩ মিটার (১.৬ থেকে ৯.৮ ফুট) উচ্চতার সুনামি আঘাত হানার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে এই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, "আমরা সুনামি সতর্কতা তুলে নিয়েছি, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করা অব্যাহত রাখব।" ইতিমধ্যে নাগেকেও রিজেন্সিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার উচ্চতার ছোট সুনামি তরঙ্গ সনাক্ত করা হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় 'রিং অব ফায়ার'-এ অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির তৎপরতা দেখা যায়। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পটি হয়েছিল ২০০৪ সালে সুমাত্রার উপকূলে, যার মাত্রা ছিল ৯.১। সেই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী সুনামিতে পুরো অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু ইন্দোনেশিয়ারই ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। এছাড়া, ২০১৮ সালে লম্বক দ্বীপে ধারাবাহিক ভূমিকম্পে ৫৫০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়। একই বছর সুলাওয়েসি দ্বীপের পালুতে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামিতে ৪,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন।






























