যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক রাজনৈতিক সমাবেশে মন্তব্য করেছেন যে, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব দ্রুতই হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হবে। নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ওই সমাবেশে তিনি দাবি করেন, ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে চলে আসবে। তিনি আরও দাবি করেন, বিশ্বের বৃহত্তর স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে না।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি শনিবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের এবং ভবিষ্যতেও তা ইরানেরই থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো টুইট, সামরিক শক্তি, নির্বাহী আদেশ কিংবা নির্বাচনী প্রচারণার বক্তব্যের মাধ্যমে এই জলপথ দখল করা সম্ভব নয়।
তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাদের পরাজয় মেনে না নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইরান এই অবরোধ বজায় রাখবে। হরমুজ প্রণালী খোলা বা বন্ধ করার পূর্ণ কর্তৃত্ব কেবল ইরানের হাতেই রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বর্তমানে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথটি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে, যা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট। সংঘাত শুরুর পর থেকে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন যে, খুব দ্রুতই এই প্রণালী উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, তবে বাস্তবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার জন্য আমেরিকানদের কিছুটা বেশি জ্বালানি মূল্য পরিশোধ করা উচিত। তিনি জানান, এই লড়াইয়ের জন্য তিনি কখনোই দুঃখিত নন।
শুক্রবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক সপ্তাহে প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সাথে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আরাকচি আরও জানান, কাতার ও পাকিস্তান উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করলেও সেগুলোকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা বলা যায় না। এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে বা সীমিত পরিসরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি ইরান, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আঞ্চলিক জলসীমা এবং আন্তর্জাতিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই জলপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার যেকোনো প্রচেষ্টা বড় ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণার বিষয়টি ট্রাম্প নিছক কৌতুক হিসেবে বলেছিলেন। এর আগেও ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করা বা গ্রিনল্যান্ড কেনার মতো বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন রণতরী এই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এই সময়কাল মোটেও যথেষ্ট নয়। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমান রণতরীটির পরিবর্তে আরেকটি সমপর্যায়ের জাহাজ সেখানে মোতায়েন করা হবে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান তাদের অবস্থানে অনড় থাকায় এই জলপথের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। এখন দেখার বিষয়, উভয় পক্ষ আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে পারে কি না।
সূত্র: গালফ নিউজ































