নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার রহস্যময় সতর্কতা জারি করেছে রাশিয়া। একে ক্রেমলিনের একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। গত ১৮ আগস্ট রাশিয়ার এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কর্পোরেশন নিউজিল্যান্ডের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (সিএএ) এই ‘মহাকাশ কার্যক্রম’ সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তা পাঠায়।
নিউজিল্যান্ডের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে একটি ‘নোটিশ টু এয়ারমেন’ (নোটাম – NZZO B3996/26) জারি করে। এতে জানানো হয়, আগামী ২৭ আগস্ট পর্যন্ত দক্ষিণ মহাসাগর-অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের ৫৮ থেকে ৬৮ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে একটি বিদেশি সংস্থার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ এবং মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ ফিরে আসার কার্যক্রম চলবে। এই সতর্কতার কারণে ওই এলাকায় বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার পরপরই ক্রাইস্টচার্চ থেকে অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি সি-১৭ কার্গো বিমান উড্ডয়নের কয়েক ঘণ্টা পর মাঝআকাশ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের যৌথ ঘাঁটি লুইস-ম্যাককর্ড-এর ৬২ ও ৪৪৬তম এয়ারলিফ্ট উইংসের ক্রুদের পরিচালিত এই ফ্লাইটটি ছিল চলতি মৌসুমের প্রথম অ্যান্টার্কটিকা ফ্লাইট।
নিউজিল্যান্ডের সমুদ্রসীমা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘স্টারবোর্ড’ জানিয়েছে, কথিত এই উৎক্ষেপণ এলাকায় রাশিয়ার কোনো যুদ্ধজাহাজ বা নজরদারি জাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়নি। এর আগে গত জুনে চীন যখন দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দূরপাল্লার পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছিল, তখন তারা গতিপথ পর্যবেক্ষণ ও ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহের জন্য তিনটি মহাকাশ ট্র্যাকিং জাহাজ পাঠিয়েছিল। ফলে রাশিয়ার এই সতর্কবার্তাকে একটি ‘ভুয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ভুয়া সতর্কতা’ বা তথ্যগত যুদ্ধ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স জানিয়েছেন, রাশিয়ার দেওয়া তথ্যগুলো অস্পষ্ট ছিল এবং সরকার এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
এই ঘটনাটি নিউজিল্যান্ডের একটি পুরোনো রাজনৈতিক কৌতুককে মনে করিয়ে দিচ্ছে। ২০১০ সালে জাপানে অ্যাপেক (APEC) শীর্ষ সম্মেলনে নিউজিল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন কি রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভকে ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নিউজিল্যান্ডে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে। মেদভেদেভ তার এক কর্মকর্তাকে হিসাব করতে বলেন এবং হাসিমুখে জবাব দেন, "২২ মিনিট, তবে আমি আপনাকে আগেই ফোন করে জানিয়ে দেব।" বিশ্লেষকদের মতে, এবার রাশিয়া হয়তো সেই কৌতুকটিকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যে অঞ্চলে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে, সেটি নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ড থেকে প্রায় ১,৯০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রস সাগরের কাছাকাছি অবস্থিত। এই রুটে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বিমান চলাচল করে, যা বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণা ঘাঁটিতে পৌঁছে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকমুর্ডো ও সাউথ পোল স্টেশন, নিউজিল্যান্ডের স্কট বেস, দক্ষিণ কোরিয়ার জাং বোগো স্টেশন এবং ইতালির মারিও জুচেলি স্টেশন। তবে রাশিয়ার এই হুমকির নেপথ্যে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং রুশ ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজের ওপর নিউজিল্যান্ডের সামুদ্রিক বিধিনিষেধ বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইতালীয় নৌবাহিনী রাশিয়ার একটি ছায়া জাহাজে তল্লাশি চালানোর পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, "আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কিছু দেশের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘন করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আমাদের অর্থনৈতিক অপারেটরদের জাহাজের চলাচল সীমিত করার চেষ্টা করছেন… এটি জলদস্যুতা এবং লুণ্ঠন ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি এমনটা ঘটে, তবে আমাদেরও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে হবে—অবশ্যই তা সেই জলসীমায় নয় যেখানে তারা আমাদের জাহাজে হানা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, বরং প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের দায়িত্বাধীন এলাকাসহ যেকোনো স্থানে আমরা তা করতে পারি।"
রুশ সংবাদ সংস্থা তাস (TASS) সম্প্রতি কুরিল দ্বীপপুঞ্জে রাশিয়ার নৌবাহিনীর মহড়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বোরি-ক্লাসের পারমাণবিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিন ‘আরএফএস ভ্লাদিমির মনোনাক (কে-৫৫১)’-এর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সাবমেরিনটি সেই ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম যা ২২ মিনিটে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছাতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর অনুপস্থিতি এবং চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান যৌথ টহল এ অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, নিউজিল্যান্ডের বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়তো ভবিষ্যতে আর এই কৌশলগত বৈশ্বিক সংঘাত থেকে তাদের রক্ষা করতে পারবে না।





























