যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের হুমকি দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে গত পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের দাবি, ইরান আন্তর্জাতিক চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে দেশটির বিরুদ্ধে এখন ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানো হবে।
নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বড় হাতের অক্ষরে লেখা ওই পোস্টে ট্রাম্প জানান, ইরানকে এখন নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো দেশ যদি তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা প্রদান করে, তবে সেই দেশকেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতির শিকার হতে হবে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার আওতায় তেল চোরাচালান, পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্র, জাহাজ নিবন্ধন এবং ইরানের হয়ে কাজ করা ভুয়া কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপকে তিনি ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং মিত্র দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগেও গত এপ্রিল থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযান চালিয়ে আসছে। এর লক্ষ্য হলো তেহরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং জ্বালানি রপ্তানি থেকে দেশটির আয়ের উৎস পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। এরই অংশ হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ, তেল ও আর্থিক খাতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যস্থতাকারী ও ট্যাংকারগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের এই নতুন হুমকির বিষয়ে ইরান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও, দেশটির গণমাধ্যম একে গুরুত্বহীন হিসেবে দেখছে। আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, তবে ইরান এসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার কৌশল আয়ত্ত করেছে। এছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, সামরিক আগ্রাসনে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্প এখন বিভ্রান্তিকর দাবির মাধ্যমে অর্থনৈতিক যুদ্ধের কথা বলছেন।
ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক মাইক হান্না ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে এক ধরনের হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ইরানের ওপর ইতোমধ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় নতুন করে আর কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ, যেখানে তিনি চলমান সংঘাতের বিরোধী ভোটারদের সামনে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে চীন, তুরস্ক ও ইরাকের মতো দেশগুলো। ব্র্যান্ডাইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতির অধ্যাপক নাদের হাবিবির মতে, ট্রাম্প চীনের ছোট ‘টিপট রিফাইনারি’ বা স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলোকে সেবা দেওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন। তবে চীন সরকার ইতিমধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সহযোগিতা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজারের ব্যবস্থাপনা প্রধান ব্রেট এরিকসন মনে করেন, চীনের ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ট্রাম্পের হাতে থাকা সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ নিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে এবং যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তিনি আরও বলেন, ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থলপথে বাণিজ্য বন্ধ করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের তেল বিদেশে বিক্রিতে সহায়তার অভিযোগে বিভিন্ন কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও ট্যাংকারকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘হতাশা’ প্রকাশ পাচ্ছে ট্রাম্পের বক্তব্যে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে দেশটির গণমাধ্যম নতুন ঘোষণাকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হান্নার মতে, ইরানিদের কাছে এটি আরেকটি হুমকি বলেই মনে হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই নির্দিষ্ট পদক্ষেপের তথ্য না থাকলেও জনসমক্ষে নিজের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরতে ট্রাম্প এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের তেল কেনার ক্ষেত্রে এসব শোধনাগারই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ































