দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে এই ভোটগ্রহণ চলবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ঐতিহাসিক এই নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সংসদ সচিবালয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ভোট গণনা শেষে অধিবেশনকক্ষেই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ। তবে সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছে। বর্তমান সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মোট ২৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০। এছাড়া সংসদে আটজন স্বতন্ত্র এবং জোটের বাইরে থাকা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
নির্বাচনী কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন গতকাল নির্বাচন ভবনে তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথম ভোটগ্রহণের ৩৫ বছর পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হতে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের দিকে পুরো দেশ ও বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে। তিনি জানান, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ভোটগ্রহণ চলাকালে সম্প্রচার বন্ধ থাকলেও বিকেল ৫টায় ভোট গণনা শুরু হলে তা আবার সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সিইসি আরও জানান, এটি একটি উন্মুক্ত নির্বাচন হবে, যেখানে ব্যালটে প্রার্থীর নামের পাশে ভোটারের নাম উল্লেখ থাকবে। দীর্ঘদিন পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও সব ধরনের প্রস্তুতি ও মহড়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল বুধবার সংসদ ভবনের নবম তলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংসদ সদস্যদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অনেক ত্যাগ ও মূল্যের বিনিময়ে দেশ আজ এই ঐতিহাসিক অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে সর্বত্র জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা হবে। তিনি দলের দুঃসময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অসীম সাহসিকতা ও নেতৃত্বের প্রশংসা করে তাঁকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দায়িত্ব পালনকালে কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস না করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, আজ ভোট শুরুর আগে তাঁদের সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জোটের ভোটারদের অলি আহমদকে ভোট দেওয়ার আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতেই তাঁরা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বলে জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আয়োজনে এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকবেন।
অন্য এক প্রসঙ্গে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন আইনজীবী ইউনূছ আলী আকন্দ। এর আগে গত মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ তাঁর রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। আদালত আদেশে বলেন, একই বিষয়ে ২০১৭ সালেও রিট করা হয়েছিল যা পরে খারিজ হয়ে যায় এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা হয়নি। ফলে নতুন করে এই রিটের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই এবং ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সংসদেরই রয়েছে।
শুনানির পর ২০১৮ সালে রিটটি খারিজ করা হয়।



























